২৫ মে ২০১৯

...
...


৫ মিনিটে প্রায় ৬০০ মুক্তিকামী বাঙালিকে হত্যা করে ওয়াহিদুল

লেখক: একাত্তর ডেক্স

তারিখ: ১১ মে ২০১৮



যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি মেজর (অব.) মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে একাত্তরে ভয়ংকর গণহত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যে কয়জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিলেন, ওয়াহিদুল হক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর বিরুদ্ধে রংপুর সেনানিবাস এলাকায় পাঁচ মিনিটে প্রায় ৬০০ মুক্তিকামী বাঙালিকে হত্যার ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে চলমান তদন্তে। তাঁর আরো অপরাধ সম্পর্কে জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্ত সংস্থা। এ জন্য অনুমতি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত সংস্থার সেফ হোমে আগামী ১৫ মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ওয়াহিদুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর গত ২৪ এপ্রিল পুলিশ গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে।

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও এনএসআইয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ওয়াহিদুলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তালিকাভুক্ত করা হয় ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর। সেই অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত চলছে। তদন্ত পরিচালনা করছেন তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মতিউর রহমান। মতিউর রহমান জানান, ‘এ মামলা তদন্ত করতে এবং আরো তথ্য জানতে ওয়াহিদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী ১৫ মে ধানমণ্ডিতে তদন্ত সংস্থার সেফ হোমে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও অভিযানে অংশগ্রহণকারী স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করেন ওয়াহিদুল হক। তখন তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন। ঘেরাও অভিযানে প্রায় ৬০০ নিরস্ত্র বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য শহীদ হন।

ওয়াহিদুল ১৯৬৬ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১১ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে কমিশন পান। ১৯৭০ সালে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে বদলি হয়ে রেজিমেন্টের সঙ্গেই পাকিস্তান থেকে রংপুর সেনানিবাসে চলে আসেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে তিনি ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পর রংপুরের রাজনৈতিক নেতারা সর্বদলীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার একটি উপায় বের করার পরিকল্পনা করছিলেন। তখন রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত একজন বাঙালি সৈনিক তাঁদের কাছে এক গোপন বার্তা পাঠান। ওই গোপন বার্তায় তিনি বিপুলসংখ্যক মুক্তিকামী বাঙালি সমাবেশ করে রংপুর সেনানিবাসকে চারদিক থেকে ঘেরাও করার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অনুরোধ করেন। বার্তায় আরো জানানো হয়, সেনানিবাসে কর্মরত সব বাঙালি সেনা সদস্য তাঁদের নিজ নিজ অস্ত্র নিয়ে ওই ঘেরাও অভিযানে অংশ নেবেন এবং সেনানিবাস দখল করবেন। রাজনৈতিক নেতারা ওই বার্তা পাওয়ার পর সর্বসম্মতিক্রমে ২৮ মার্চ সেনানিবাস ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত নেন।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার একটি সূত্রে জানা যায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৮ মার্চ দুপুরে ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সেনানিবাসের আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙালি এবং সাঁওতাল ও ওঁরাও সম্প্রদায়ের ৩০-৩৫ হাজার লোক সমবেত হয়। তীর-ধনুক, দা-বল্লম, বাঁশ ইত্যাদি নিয়ে সেনানিবাস ঘেরাও করে তারা।

সূত্র মতে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সগির সৈয়দ ঘেরাও অভিযানের তথ্যটি নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে পেয়ে গিয়েছিলেন। সে অনুসারে ওই অভিযান বানচালের গোপন ছক কষা হয়েছিল। ঘেরাও অভিযান বানচালের পরিকল্পনাটি কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২৮ মার্চ সেনানিবাস ঘেরাও অভিযান শুরু হলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্রাউনিং মেশিনগান সজ্জিত ১০টি সামরিক জিপ অগ্রসরমাণ মানুষের মিছিল বরাবর তাক করে স্থাপন করা হয়। ওই ১০টি জিপের মধ্যে একটি ছিল তৎকালীন ক্যাপ্টেন ওয়াহিদের নিয়ন্ত্রণে। ঘেরাও অভিযানে অংশগ্রহণকারী মানুষের ঢল সেনানিবাসের সীমানার নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু হয়। একটানা অবিশ্বাস্য বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ৫০০ থেকে ৬০০ স্বাধীনতাপ্রত্যাশী মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে ২৩ সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াহিদুল হকও চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান তাঁকে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করার সুযোগ দেন।

আলোকচিত্র

কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মেজর (অব.) মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হক

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট