১৭ আগস্ট ২০১৯

...
...


সত্য মামলা আগরতলা, আসলেই কি ষড়যন্ত্র ছিল?

লেখক: চৌধুরী শহীদ কাদের

তারিখ: ২৩ জানুয়ারী ২০১৭



সত্য মামলা আগরতলা, আসলেই কি ষড়যন্ত্র ছিল? শেখ মুজিব কেনো গিয়েছিলেন আগরতলায়? পাকিস্তান সরকার কেনোই বা ছয় বছর পর মামলা করতে গেলেন?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনালোচিত বিষয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব পরিণত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুতে, এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের অধীনতার বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের সংগঠিত আন্দোলন জনসম্পৃকতা পায়।

প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি শেখ মুজিব এই ধরনের গোপন কোন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ছিল? কিংবা এই মামলা কি আসলেই ষড়যন্ত্র মামলা ছিল কিনা?

আগরতলার সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী পড়ে এই মামলার বিষয়ে আমার প্রথম কৌতুহল জন্মে। আত্মজীবনীতে তিনি উল্লেখ করেছেন শেখ মুজিবের আগরতলা যাত্রা, ভারতের সহায়তা লাভের চেষ্টা। এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে বিষয়ে ঢাকায় লেখকের সাথে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করেছেন অনিল ভট্টাচার্য।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দলিল আমার হাতে আসে শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক কবে আগরতলায় আসেন। তিনি একবারই এখানে এসেছিলেন, যার সাল তারিখ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন তিনি ১৯৬৩ সালে এসেছিলেন। আমরা খোয়াইয়ের তৎকালীন সাবডিভিশনাল অফিসার স্মরজিৎ চক্রবর্তীর ডায়েরি পেয়েছি, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলায় আসার তারিখ উল্লে­খিত আছে। আগরতলার প্রখ্যাত সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, ১৯৬১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব খোয়াই সীমান্ত হয়ে আগরতলা আসেন। (কল্যাণব্রত চক্রবর্তী (সম্পাদিত), এপারে একাত্তর, অক্ষর, ত্রিপুরা, ১৯৯৭, পৃ ১২ ) নিরাপত্তার খাতিরে তাকে রাতে আগরতলা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচিন্দ্রলাল সিংহ কারাগারে প্রায় দুই ঘন্টা শেখ মুজিবের সাথে আলাপ করেন। পরের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব সালদা নদী পার হয়ে পূর্ব বাংলায় ফিরে যান। খোয়াইয়ের তৎকালীন সাবডিভিশনাল অফিসার স্মরজিৎ চক্রবর্তীর ডায়েরীতে দেখা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার ১৯৬২ সালে শেখ মুজিব আসারামবারি তথা খোয়াই সীমান্তে পৌঁছান।( অমিতাভ ভট্টশালী, শেখ মুজিবুর রহমান কবে গিয়েছিলেন আগরতলায়?, বিবিসি বাংলা, লন্ডন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫) শেখ মুজিবের সঙ্গী ছিলেন টি চৌধুরী ও আমীর হোসেন নামক জনৈক দু’জন লোক। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তাদের তেলিয়ামুড়া পাঠানো হয়, সম্ভবত ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর কাছে বিশেষ আর্জি নিয়ে শেখ মুজিব আগরতলা গিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান যে সেই যাত্রায় আগরতলায় যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে সমর্থন যোগাড় করতে, সেই খবর পৌঁছেছিল পাকিস্তানি গুপ্তচরদের কাছে।

মি. পাল বলছিলেন, “ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ শেখ মুজিবের আর্জি পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন নেহরুর কাছে। তবে আইএসআই এই খবর জেনে যাওয়ায় তাঁকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর জন্য কিছুটা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয়েছিল। তাঁকে পুশব্যাক করার আগে নিয়মরক্ষার জন্য একরাত আগরতলায় জেলে রাখতে হয়েছিল।”

এই মামলার অন্যতম দুই অভিযুক্ত স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান আর আলি রেজা যে বিলোনিয়া দিয়ে ত্রিপুরায় এসে একজন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা কর্ণেল মেননের [যাঁর আসল নাম কে শঙ্করণ নায়ার বলেই মনে করা হয়, যিনি ভারতের বর্হিদেশীয় গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং এর দ্বিতীয় প্রধান হয়েছিলেন] সঙ্গে শালবাগানে দেখা করে ভারতের সাহায্য চেয়েছিলেন, সেটা অনেকেরই জানা তথ্য। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ‘বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন’ গ্রন্থে ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগরতলা যাত্রার রোমাঞ্চকর কাহিনী তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, মমিনুল হকের স্মৃতিচারণ, মানস পালের প্রবন্ধ, এসডিও এর ডায়েরি পড়ে নিশ্চিত হওয়া যায় বঙ্গবন্ধু ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ আগরতলা যান। এবং এই যাত্রা ভারত সরকারের গ্রীন সিগন্যালেই হয়েছে। যাই হোক ধারণা করা হয় বিষয়টি সাথে সাথে পাকিস্তান সরকার জানতে পারে। মুনতাসীর মামুন নিশ্চিত করে লিখেছেন, ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ এই কারণে তাকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি পাকিস্তান সরকার চেপে গিয়েছিল। অনেক পরে ১৯৬৮ সালে সরকার এই বিষয়ে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিষয়টাকে জনসম্মুখে আনেন। শেখ মুজিবের পক্ষে সেই মামলা লড়েছিলেন ব্রিটেনের রাণীর আইনজীবী টমাস উইলিয়াম। আর এটা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ।

পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে ওই মামলায় মিথ্যা অভিযোগে জড়িয়ে দেওয়ার পরে ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ তাঁর হয়ে বড় ব্যারিস্টার খুঁজতে যে আগরতলার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র জাগরণ এর মালিক-স¤পাদক জিতেন পালকে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন।

মানস পালের কথায়, “জিতেন পালকে কলকাতায় পাঠানো হয় প্রখ্যাত ব্যারিস্টার ও কমিউনিস্ট নেতা হোংশু আচার্যের কাছে যাতে তিনি ঢাকায় গিয়ে শেখ মুজিবের হয়ে মামলা লড়েন। কিন্তু মি. আচার্য রাজি হননি কারণ তাতে ভারতের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে যেত পাকিস্তান। তাই তিনি ইংল্যান্ডে নীরদ সি চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় শেখ মুজিবের হয়ে ঢাকায় মামলা লড়তে আসেন টমাস উইলিয়ামস।

মূলত আগরতলা মামলা ত্রিপুরা এবং পূর্ববঙ্গের জনগণকে এক আত্মার বন্ধনে জড়ায়, একাত্তরে সেই আত্মিক সম্পর্কের চুড়ান্ত প্রতিফলন ঘটিয়েছেন ত্রিপুরার আমজনতা।

লেখক : চৌধুরী শহীদ কাদের, সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আলোকচিত্র

বঙ্গবন্ধু

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট