১৩ আগস্ট ২০২০

...
...


২৬ জুন ১৯৭২ : নোয়াখালীর মাইজদি জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

লেখক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

তারিখ: ২৬ জুন ২০২০



আমার ভাইয়েরা ও বোনেরা, আপনারা অনেক কষ্ট করে অনেক দূর থেকে এসেছেন। আপনাদের আমি কষ্ট দিতে চাই না, বেশী সময় আমি বিরক্ত করতে চাই না। জেলের থেকে বের হয়ে আসার পরে ভেরেছিলাম আপনাদের কাছে তাড়াতাড়ি আসব কিন্তু আসতে পারি নাই, আমি জানি, আমি যখন জেলের মধ্যে বন্দি ছিলাম পশ্চিম পাকিস্তানে, আমি জানি যখন আমি দিন গুনছিলাম কবে আমার ফাঁসি হবে। আমি জানতাম, আপনারা আমার মা-বোনেরা-ভাইয়েরা বাংলার গ্রামে গ্রামে রোজা রাখতেন, দোয়া করতেন এবং এই পিচাশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছিলেন। আপনারা যে পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী আমার দেশের কি সর্বনাশ করেছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে হত্যা করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথের ভিখারী করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার কোটি ছেলেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। আমার জমির ক্ষেতের ফসল জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার রাস্তা ঘাট ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। আমার রেলরাইন ভেঙ্গে দিয়েছে। আমার ফ্যাক্টরি কারখানা নষ্ট করেছে। আমার ছেলেদের কাপুরুষের মতো ঘরের থেকে ধরে নিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটেছে। তারা বলে মুসলমান, তারা বলে মানুষ। তারা বলতেন আমরা মুসলমান। এত বড় নরপশু দুনিয়ার কোথাও পয়দা হয় নাই। আপনাদের মনে আছে যেদিন আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সেইদিন আমি বলে গিয়েছিলাম-বাংলাদেশের মানুষ, আমি জানি না তোমাদের কাছে আর কথা বলতে পারব কিনা? হতে পারে এই আমার শেষ। হতে পারে ওরা আমাকে হত্যা কবরবে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ কর। আমার পুলিশ, আমার ইপিআর, আমার সৈন্যবাহিনী, আমার সরকারি কর্মচারী, আমার শ্রমিক, আমার কৃষক, আমার বুদ্ধিজীবী, আমার ছাত্র...। লক্ষ লক্ষ মায়ের বুক খালি হয়ে গিয়েছে, লক্ষ লক্ষ ছেলে আজ হাত পা কাটা, লক্ষ লক্ষ সংসার আজ ছাড়খার হয়ে গেছে। কি পেয়েছি? আমি যেদিন জেলের থেকে বের হয়ে আসলাম। আমি যখন রেসকোর্স ময়দানে খাড়া হলাম, আমি যখন বাংলার মাটি পাড়া দিলাম। আমি চোখের পানি রাখতে পারি নাই। অনেক রাত আমি ঘুমাই নাই। অনেক দিন আমি বসে বসে কাটিয়েছি। যে দিন থেকে এসে আমি বাংলায় নেমেছি। তার পরের থেকে একদিনও আমি বিশ্রাম করি নাই। কি করব? আমার পোর্ট নাই। পোর্ট ভেঙ্গে দিয়ে গেছে। আমার গুদামের চাউল লুট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার কাগজ পত্র পর্যন্ত অফিসের জ্বালিয়ে দিয়েছে এমনকি নোটগুলো পর্যন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা লুট করে নিয়ে গেছে। বাংলার সোনা লুট করে নিয়ে গেছে। বাংলার মানুষকে হত্যা করেছে।

ভাইয়েরা আমার, ইনশাল্লাহ ৩০ লক্ষ লোকের রক্তের বিনিময়ে আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে? আজ বাংলার মানুষ না খাওয়া, আমি জানি। আমি জানি আজ বাংলার মানুষ দুঃখী, আমি জানি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খায় না, আমি জানি বাংলার মানুষের ঘর নাই। এক কোটি লোক বাংলাদেশ থেকে ভারতবর্ষে স্থান নিয়েছিল। দেশত্যাগ করে গিয়েছিল। এক কোটি লোক এসেছে। কোথায় আমি খাবা পাব? কোথায় আমি টিন পাব? কোথায় আমি পয়সা পাব? কোথায় বাংলার মানুষকে পেটভরে খাবার দিব। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন চিন্তা করেছি কি করব? কিন্তু জানি আমার বাংলার মানুষ দুঃখী। আমি দেখলাম যে সব গেছে কিন্তু বাংলার মানুষ, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার বাতাস, বাংলার নিঃস্বার্থ কর্মীকে হত্যা করতে পারে নাই। ইন্শাল্লাহ সোনার বাংলা একদিন সোনার বাংলা হবে। এ দেশের মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে।

জালেম আমার সম্পদ নিতে পারে। জালেম আমার টাকা নিতে পারে, জালেম আমার ঈমান নিতে পারে নাই, জালেম আমার মাটি নিতে পারে নাই। ইনশাল্লাহ যদি বাংলার মানুষ সৎ পথে থাকে, ভালভাবে কাজ করে। ইমানদারির সঙ্গে কাজ করে। আমি বিশ্বাস করি সোনার বাংলার মানুষ আবার সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারবে এই বিশ্বাস আমার আছে।

ভাইয়েরা আমার, আমি দেখলাম কি শতকরা ৬০ জন পুলিশকে হত্যা করেছে। নোয়াখালীর ভাইয়েরা আমার এখনও আমার পাষণ্ডের দল ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা করেও শান্তি পায় নাই। আমার চার লক্ষ বাঙালিকে পশ্চিম পাকিস্তানে আটিকিয়ে রেখেছে। ভুট্টো সাহেব তাদেরকে দিবেন না। ভুট্টো সাহেব তাদের নিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। ভুট্টো সাহেব তাদের ছাড়বেন না। ভুট্টো সাহেব মনে করেছেন যে বাংলার মানুষকে আটকিয়ে রেখে তিনি আমাদের মাথা নত করাবেন। যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে, সে জাতি কারো কাচে মাথা নত করতে জানেনা। ভুট্টো সাহেব, আল্লাহ যদি আমাকে বাঁচায়া রাখে ভুট্টো সাহেব, বাংলার মানুষকে আমি বাংলায় ফিরিয়ে আনব, আপনি রাখতে পারবেন না। আপনি মনে করেছেন তাদের আটকিয়ে রাখলে যারা যুদ্ধাপরাধী তাদের আমি বিচার করব না। যারা আমার দুই লক্ষ মা বোনের উপর পাষবিক অত্যাচার করেছে, যারা আমার ছেলেদের নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। যারা আমার গরীবের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। যারা আমার মা বোনকে পথের ভিখারী করেছে তাদের বিচার এই বাংলার মাটিতে হবে যদি আমি বেঁচে থাকি।

ভুট্টো সাহেব, আপনি জানেন মৃত্যুকে আমি ভয় করি না। মেশিন গানের সামনে আমি বুক পেতে দাঁড়াতে পারি। আপনি জানেন ফাঁসির জন্য আমার কবর খুঁড়ে ছিলেন কিন্তু আমি মাথা নত করি নাই। এই জন্য আমার বাংলার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। ভুট্টো সাহেব, অবশ্য এখনও বাংলাদেশকে তিনি মানেন না। বাংলাদেশ বলে স্বাধীন না। দুনিয়ার ৭৫টা দেশ মেনেছে। দুনিয়ার জাতিসংঘের অনেক কমিটির আমি সদস্য হয়েছি। উনি বাংলাদেশকে মানেন না। আমি তোমাদের মানি কিনা সেইটাই বড় কথা, তুমি আমারে মানা না মানার কথা পরে।

আমার দেশ বাংলাদেশ, আমার স্বাধীনতা থাকবে, আমার পতাকা থাকবে। আমার বাংলাদেশের মানুষ, তোমাদের গোলামী আর কোনদিন আমরা করতে পারব না। সুখে থাক, সুখে, আরামে থাক আর্শিবাদ করি। পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর, আল্লাহর কাছে মাপ চাও, যা করেছ আর যা নিয়েছ ভদ্রলোকের মতো হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে গেছ। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদ আমার বাংলা থেকে লুট করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়া গেছ। এখন বড় বড় কথা বলে, ওনারা বলে মুসলমান, ওনারা বলে ইসলামের কথা বলেন। ঘরে ঘরে মদ খাইয়া পইড়া থাকেন আর ইসলাম ইসলাম করেন। বাংলাদেশে আমি মদ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তুমি বন্ধ করতে পার নাই। তুমি পারবা না।

আমার নাই কিছু। আপনাদের আমি কিছু দিবার পারব না। দেব কোত্থেকে। হ্যাঁ একথা সত্যি, আপনাদের যত বকেয়া খাজনা ছিল সব আমি মাফ করে দিয়েছি-দেই নাই? আপনাদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা রোজ কেয়ামত পর্যন্ত মাপ হইয়া গেছে। আমি কইরা দিয়েছি। আপনাদের গ্রামে গ্রামে টাকা দেওয়া হয়েছে। আপনাদের লবণের খাজনা মাপ কইরা দেয়া হয়েছে। আমি পাব কোথায়? আমি দেব কোত্থেকে? আমি তো মাইনষের কাছে বাংলার স্বাধীনতা বিক্রি করে পয়সা আনতে পারি না। কোটি কোটি মন খাবার আমার আনতে হচ্ছে। আরেকটা অসুবিধা হয়ে গেছে, আমি ভিক্ষা টিক্কা কইরে আনি, গ্রামে গ্রামে পাঠাই, ডাকাত দল এগুলো চাইটা চাইটা খায়। চুরি করে খায়। আমি সাবধান করে দিচ্ছি, খবরদার গরীবের হক কেউ মাইরা খাবা না। আমি গরীবের জন্য, গরীব আমার জন্য। বাংলাদেশে গরীব কৃষকের রাজ্য কায়েম হবে। বাংলাদেশে গরীবের রাজ্য কায়েম হবে। শোষণের রাজ্য কায়েম হবে না। ভাইয়েরা আমার, ঘুষ দুর্নীতি খাওয়া বন্ধ কর। ঘুষ খাওয়া বন্ধ কর। গরীবের রক্ত চোষা বন্ধ কর। না হলে ভালো হবে না। তোমরা আমাকে চেন। আজকে ২২ তারিখ, বড় বড় গাড়ি দখল করেছে জায়গায়। আজ ২২ তারিখ ৪টা বাজে। এই চারটার পর থেকে বড় বড় শহরে অ্যাকশন নেয়া হবে। যাদের বাড়ি ঘর লুট হবে। তাদের বাড়ি ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হবে। যাদের গুদামে চাল রেখে চালের দাম বাড়ায়ে গরীবকে লুট করে খাবার চায়, সাবধান হয়ে যাও। আইন আমি পাশ করছি। আইন আমার প্রক্রিয়ায় আছে। দরকার হয় এমন আইন করব যে প্রকাশ্য জায়গায় গুলি করে মারা হবে-কেউ খবর পাবে না। কিন্তু গরীবকে লুট করে খেতে দেওয়া হবে না।

ভাইয়েরা আমার, বোনেরা আমার, একদল লোক আছে, রাস্তায় বের হইছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখে নাই। ইয়াহিয়া খানের দালালী করেছে, আইযুব খানের দালালী করেছেন, এখন আমি গণতন্ত্র দিয়েছি ওনারা কথা বলতে শুরু করেছেন। খুট খাট, পুসপাস, ফুসফাস করেন। একটু আস্তে আস্তে কর, ছিলা কোথায় চাঁনরা, করেছিলা কি চাঁনরা-দালালী করেছ? ইয়াহিয়া খানের? পয়সা খেয়েছ আইয়ুব খানের, পয়সা খেয়েছ ইস্কান্দার মির্জার। যখন জীবনের দশটি এগারটি বৎসর আমি জেলের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি, আমার সহকর্মীদের জেলের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছে তখন তোমরা বসে বসে কোরমা পোলাও খেয়েছ। এখন সুযোগ পাইয়া এটা করল না, ওটা করল না। কোত্থেকে আসবে? করব কোত্থেকে? কাজ করতে হবে। ফসল উৎপাদন করতে হবে। কারখানায় কাজ করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাহলেই তো পয়সা আসবে। তাহলেই তো মানুষকে কাজ দিতে পারব। তা না হলে পারব কোত্থেকে? বাজে কথা বললে চলবে না, আমি মিথ্যা কথা বলি না। রেসকোর্স ময়দানে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আমি তোমাদের কি দিয়েছি? প্রায় ১০০ কোটি টাকার মত রিলিফ এই বাংলাদেশে দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ২৬ কোটি টাকার ট্যাক্স ফ্রি দেয়া হয়েছে। খাজনা, ট্যাক্স মাফ করা হয়েছে।

আপনারা জানেন কোটি কোটি মন চাল আনতে হচ্ছে আমাকে গ্রামে গ্রামে পৌঁছানোর জন্য। কোটি কোটি মন চাউল-ট্রাক নাই, বাস নাই, রেলওয়ে নাই, পুল ভাঙ্গা ছিল। দুনিয়া থেকে চাল কিনব, চিটাগাং পোর্টে আনব। সেখান থেকে গ্রামে পৌঁছাইয়া দিব। অন্ততপক্ষে প্রত্যেকটা গ্রামে গ্রামে কিছু কিছু খাবার আপনাদের জন্য আমি পৌঁছায়াছি এই ভাঙ্গা হাতে। কিন্তু নাই কিছু। আমি কিছু দেবার পারব না, আমি মিথ্যা ধোকা আপনাদের দেই না। কোনদিন দেইনি, কোনদিন দেব না। তিন বৎসর আমি আপনাদের কিছুই দেবার পারব না, আপনারা রাজী আছেন কিনা আমি জানতে চাই? তার মানে আমি দেব না এটা ঠিক না। আমি যেখান থেকে পারি, ভিক্ষা কইরা আইনা বাংলার গরীবের সামনে আমি হাজির করার চেষ্টা করব। কিন্তু গরীবের খেয়ে বাঁচতে হবে। কিন্তু একটা কথা নাকে খৎ দিয়া দুনিয়ার কাছ থেকে আমি আনতে পারব না। সত্য কথা ভারতবর্ষ আমারে দুই তিন কোটি মন খাবার দিয়েছে। ইউনাইটেড ন্যাশন থেকে আমি ছয় লক্ষ টন খাবার পাচ্ছি। তার মধ্যে ইউএসএ চার লক্ষ টন দিয়েছে। রাশিয়া আমার বন্ধু, তারা আমাকে দিচ্ছে। অষ্ট্রেলিয়া কানাডা সেখান থেকে আমি আনছি। বার্মা থেকে চাল আমি কিনছি, জাভা থেকে চাল আমি কিনতেছি। কিন্তু জাহাজ নাই। জাহাজ ভাড়া কইরা আনতে হবে। চট্টগ্রামে পৌঁছুবে, ট্রাক লাগবে, রেল লাইন ইঞ্জিন নাই, পাঠাতে হবে নোয়াখালী, পাঠাতে হবে গ্রামে, সময় লাগবে ভাই, সময় লাগবে। মিথ্যা ধোকা দেবার পারব না। আমি কাউকে ধোকা দেই না।

তবে বাংলার যে সম্পদ, এই সম্পদ আপনাদের। যেখান থেকে আয় করি না কেন, যেখান থেকে আনি না কেন, সে সম্পদ বাংলার গরীবের জন্য আনা হবে। স্কুল-কলেজ হয়ে গেছে। তার জন্যে টাকা দিতে হবে। এছাড়াও গরীব কর্মচারী যারা না খেয়ে কষ্ট পেত, তাদের আমি মাসে ২৫ টাকা, ২০ টাকা, ১৫ টাকা বেতন বাড়ায়া দিছি। তাতে আমার দিতে হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। কোথায় পাব? কোন জায়গা থেকে আসবে? কিভাবে দেব? বিশ্বাস করেন ভাইয়েরা আমার, আমি রাত্রে ঘুমাতে পারি না, আমি চিন্তা করতে পারি না জেল থেকে যেদিন আমি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসছি, তারপরের থেকে একদিনও আমি বিশ্রাম করি নাই। আমার পক্ষে দিনের আরাম, রাতের বিশ্রাম হারাম হয়ে গেছে। আমি আপনাদের দিতে চাইতে পারি না। আমি দেখলে আমার বুক ফেটে যায়। আমি আসতেছিলাম। ট্রেন আসে না। আমি রাস্তার উপর ট্রেন থামাইছি। ট্রেন থামছে, আসতে পারে না। গ্রামের লোক দাঁড়াইয়া রইছে বাবা তোমারে একটু দেখব ও তোমার কাছে কিছু চাই না, তোমারে দেখব। আপনারা আমারে দোয়া কইরেন, আপনারা যেভাবে আমাকে ভালোবাসেন, আমি যেন আপনাদের এই ভালোবাসা নিয়া মরতে পারি। এর বেশি কিছু আমি আপনাদের কাছে চাই না। আপনারা আমাকে ভালোবাসেন, আমিও আপনাদের ভালোবাসি। মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। আমার দেবার মত যা আছে-একটা জান, তা বাংলার মানুষের জন্য আমি মর্গেজ করে দিয়েছি।

ভাইয়েরা আমার, একটা কথা বলে যাবার চাই। লাইটেল ফাইটেল আর চলবে না। ১০০ বিঘার বেশী জমি কেউ রাখতে পারবে না এবং বাকী জমি, যাদের জমি নাই তাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। আমি ডিসি সাহেবকে অর্ডার দিয়ে রাখছি-দেখেন কোন কোন লাঠিয়াল জমি দখল করে রাখছে, সোজা জেলখানায় দিয়ে দেন আর গরীবের মধ্যে সে জমি ভাগ করে দেন। কোন ভয় নেই আপনার, ছাড়বা না। ১০০ বিঘার বেশী কেউ রাখতে পারবে না। বাকী যা আছে তা গরীবের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে-এটাই গভর্নমেন্টের আইন এবং এই আইনই কাজ হবে এবং আমি সরকারি কর্মচারীদের হুকুম দিয়ে যাচ্ছি-যত তাড়াতাড়ি হয় এর যেন ব্যবস্থা করা হয়। আর আইন শৃঙ্খলা রাখেন। চোর ডাকাত, গুণ্ডা মানুষের শান্তি যেন নষ্ট করতে না পারে। চোর ডাকাত গুণ্ডাদের আপনারা গ্রামের লোক তাদের পুলিশের কাছে দিয়া দিবেন, তাদের শাস্তি দেয়া হবে। আর কিছু কিছু রাজাকার, আলবদর যারা আমার লোকরে মারছে। তারা পলাইয়া পলাইয়া বেড়াচ্ছে এবং জায়গায় জায়গায় সুযোগ পাইয়া কাছিমের মতো মাথা বাহির করতাছে। তোমাদের যে এখন পর্যন্ত কিছু করা হয় নাই, তার অর্থ দুর্বলতা নয়-তোমরা সাবধান হয়ে যাও। তোমাদের লিস্ট আমাদের কাছে আছে। যদি বাড়াবাড়ি কর, তাহলে মনে রেখ যুদ্ধাপরাধী আইনে তোমাদের জেলে যেতে হবে। তোমাদের বিচার হবে। এ সম্বন্ধে তোমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পার।

আমার ভাইয়েরা ও বোনেরা, বহু কষ্ট করছেন। লক্ষ লক্ষ লোক। বৃষ্টি কাঁদার মধ্যে আপনারা রয়েছেন। আমার দুঃখ হচ্ছে ভাইয়েরা আমার, বোনেরা আমার। আপনাদের আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি। তবে একটি কথা বলে যাই, আওয়ামী লীগের নেতারা, আওয়ামী লীগ এই দেশের গরীবের প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ, গরীবের প্রতিষ্ঠান থাকবে। আওয়ামী লীগ গরীবের জন্য সংগ্রাম করেছে। আওয়ামী লীগ গরীবের জন্য সংগ্রাম করবে। যদি কোন আওয়ামী লীগের নেতা দুর্নীতি করে তাদের পার্টি থেকে বাহির কইরা দেও। কিন্তু আওয়ামী লীগের যেন বদনাম না হয়। আপনারা ইউনিয়নে ইউনিয়নে নিঃস্বার্থ কর্মীরা আওয়ামী লীগ সুপ্রতিষ্ঠান গয়ে তোলেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এবং সরকারি কর্মচারীর সঙ্গে এবং পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেশন কইরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। না হলে আমার মুখ কালি করবেন না, আমার মুখে কালি দেবেন না। সাত কোটি, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুখে কালি দেবেন না। আমার কর্মীদের কাছে এই আমার আবেদন। বাংলা, বাংলাদেশ প্রত্যেক বাঙালি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে কাজ করে খাবার অধিকার রয়েছে। কেউ বন্ধ করতে পারবে না।

একটা কথা বলে যাই, বাংলাদেশ চারটি নীতির উপর চলবে। জাতীয়তাবাদ, এটা হলো কি? আমরা বাঙালি। আমাদের জয় বাংলা আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। এই বাঙালি আমরা। আমরা বাঙালি না? দুই নম্বর, আমি গণতন্ত্র বিশ্বাস করি। কিন্তু গণতন্ত্র মানি। যা ইচ্ছা তাই লিখবেন। যা ইচ্ছা তাই বলবেন তাকে গণতন্ত্র বলে না। গণতন্ত্রের একটা নীতি আছে। এই গণতন্ত্র আমি বিশ্বাস করি। আপনারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করেন না?

আমরা সমাজতন্ত্র বিশ্বাস করি। যাকে বলা যায় শোষণহীন সমাজ। শোষণহীন সমাজ মানে কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। আপনারা চান না? আমরা ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। তার অর্থ ধর্ম বিরোধী নই। মুসলমান, মুসলমান ধর্ম পালন করবে। হিন্দু, হিন্দু ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান, খ্রিস্টান ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধ, বৌদ্ধ ধর্ম পালন করবে। এক ধর্ম অন্য ধর্মের উপর অত্যাচার করবে না। আর ধর্মের নামে জুয়াচুরি, পকেটমার, লুটতরাজ, ব্যবসা আর পশ্চিম পাকিস্তানের টাকা খাইয়া রাজনীতি করা চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি চলবে না, ধর্মের নামে লুটতরাজ চলবে না। তবে আমি মুসলমান। আমি মুসলমান হিসেবে আমার ধর্মকর্ম পালন করব। কি মানেন? আমার ধর্ম আমার কাছে, তোমার ধর্ম তোমার কাছে-“কুলইয়া আইয়ুআল কাফেরুনা, লা আ বুদুনা মা আতা বুদুনা ওলা আনতুম আবেদুনা মাবুদ, লাকুম দিনউকুম ওলিয়াদিন।” “তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে।” এইটাই হলো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বাংলাদেশ তাই থাকবে। তাই আমি আশা করি। আপনাদের এতে বিশ্বাস আছে? বৃষ্টি কাঁদা চলে যাক, আমিও একটু কাজকর্ম গুছাইয়া লই, সব ঠিকঠাক করি, আবার নোয়াখালি এসে আপনাদের সাথে দেখা কইরা যাব। ঠিক আছে? আমি যা বলব আপনারা তো তা করবেন? আপনারা দিনভরে পরিশ্রম করে উৎপাদন করবেন? চোরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন এবং যাতে শোষণহীন সমাজ হয়, চেষ্টা করবেন? সকলে হাত তোলেন-জয় বাংলা।

(রুদ্র সাইফুল সম্পাদিত ‘শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

আলোকচিত্র

ভাষণরত বঙ্গবন্ধু

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট