৩ জুন ২০২০

...
...


শতবর্ষের প্রবেশদ্বারে বাঙালির আন্তর্জাতিক ধারকমুদ্রা সত্যজিৎ রায়

লেখক: রুদ্র সাইফুল

তারিখ: ২ মে ২০২০



সত্যজিৎ রায়। ডাক নাম-মাণিক। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে (১৮ বৈশাখ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, দুনিয়া জাগানো মহান এই বাঙালি ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকীর প্রবেশদ্বারে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি বাঙলা চলচ্চিত্রে ঝড় তুলেছিলেন, বিশ্বের বুকে বাঙালির সম্মানকে আরো উচ্চতর করেছেন। জীবনের গভীর সত্যকে সাদামাটা অথচ অসাধারণ নৈপুণ্যে সেলুলয়েড বন্দী করেছেন তিনি। কৃতি অভিনেত্রী অপর্ণা সেন বলেছেন বাঙলা সিনেমার অমোঘ সত্যটি, ‘আমাদের, অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের সত্যজিৎ-এর কাছ থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। তাঁকে আমরা উত্তরাধিকারে পেয়েছি, তিনি যেমন পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।’ আর সত্যজিৎ রায়ের ছেলে চলচ্চিত্র নির্মাতা সন্দীপ রায় পিতার সাফল্যের বিষয়ে অকপটে বলেছেন, ‘বাবা প্রচুর হোমওয়ার্ক করে নিতো।’

সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (লেখক, চিত্রকর, ভারতীয় মুদ্রণশিল্পের পথিকৃত)। পিতার নাম সুকুমার রায় (প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার), মায়ের নাম সুপ্রভা দেবী। তাঁদের আদি নিবাস ছিলো বাংলাদেশের বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। তাঁর তিন বছর বয়সে পিতা সুকুমার রায় কালাজ্বরে মৃত্যুবরণ করেন। এই কারণে, মা সুপ্রভা দেবীকে প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টের ভেতর দিয়ে সন্তান লালন পালন করতে হয়। প্রথমেই তাঁদের আয়ের উৎস ছাপাখানাটি হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে আর্থিক অনটনের জন্য সুপ্রভা দেবী চলে আসেন তাঁর ভাইয়ের বাড়ি। সত্যজিৎ রায় লালিত হন মামার আশ্রয়ে। দৃঢ়চেতা মায়ের তত্ত্বাবধানেই তাঁর শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়। এখানে পরিচয় ঘটে তাঁর মামাতো বোন বিজয়া’র সাথে। পরে বিজয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। সত্যজিৎ প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তাঁর মায়ের কাছে। ৮ বছর বয়সে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে তিনি ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রেসিডেন্সি কলেজে। এই কলেজে প্রথম দুই বছর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করেন। শেষ বছরে বিষয় পাল্টে তিনি অর্থনীতিতে পড়েন। ফলে তাঁর লেখাপড়ার সময় দীর্ঘতর হয়ে উঠে। এই সময়ে ইনি পাশ্চাত্য চিরায়ত চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীত নিয়ে এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠেন যে, তাঁর মূল পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটে। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৪০ সালে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিএ (সম্মান) পাশ করতে সক্ষম হন তিনি।

রবীন্দ্রনাথের সাথে রায় পরিবারের বিশেষ হৃদ্যতা ছিলো। ফলে সত্যজিতের মা চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করুক। যদিও সত্যজিৎ কলকাতার মায়া ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে যেতে প্রথম দিকে অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহে ১৯৪০ সালে শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানকার কলাভবনে ভর্তি হন। এই সূত্রে তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পান। নিয়মানুযায়ী বিশ্বভারতীতে সত্যজিতের পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও তার আগেই তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। মূলত ১৯৪২ সালে কলকাতায় জাপানিরা বোমাবর্ষণ করে। এই সময় তিনি শান্তিনকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর আর শিক্ষার জন্য শান্তিনিকেতন যাননি।

শৈশবেই তিনি পেয়েছিলেন ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার মতো পরিবেশ। পুরনো কলকাতার বৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতি তাঁর জীবন ও মননে গভীর রেখাপাত করেছিলো। মানুষের বিচিত্র স্বভাব তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও রসবোধকে পুষ্ট করেছে। কিন্তু কলাশিল্পের স্বচ্ছন্দ গতি তাঁকে করেছে অনন্য। শুধু সাহিত্য নয়-সংগীত, চিত্রকলা, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ছিল তাঁর বিস্তর জ্ঞান। চিত্রপরিচালক, রহস্য কাহিনীকার, কল্পবিজ্ঞান লেখক, গুণী চিত্রকর, ছোটগল্পকার হিসেবে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রসবোধের কারণেও তাঁর লেখা পাঠকের কাছে আদৃত। তাঁর অমর সৃষ্টি ফেলুদা। বাঙলা রহস্য সাহিত্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (ব্যোমকেশ), নীহাররঞ্জন গুপ্ত (কিরীটি-সুব্রত), হেমেন্দ্রকুমার রায় (বিমলকুমার-জয়ন্ত) প্রমুখের যোগ্য উত্তরসূরি সত্যজিৎ রায়। ফেলুদা কাহিনী এত জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় হওয়ার কারণ হলো সাবলীল, স্বচ্ছ, মনোরম ও রহস্যসমৃদ্ধ ভাষা। পিতা সত্যজিতের কাছ থেকে কোন তিনটি গুণ পেয়েছেন প্রশ্নের জবাবে সন্দীপ রায় স্বীকার করছেন, “আমার বাবা কাজের ব্যাপারে খুব নির্মম ছিলো। যেমন, অনেক কষ্ট, পরিশ্রম এবং সময় নিয়ে একটা দৃশ্য ধারণ করা হলো। পরে দেখা গেলো সেটা সিনেমার ‘ফ্যাট’। তাই ফেলে দিতে হবে। এই নির্মমতা বাবা করতো। আর সিনেমায় মিউজিকটা নিজে করতো। যেটা আমিও করি। শেষটা হলো, যেকোনো কিছু করার আগে প্রচুর হোমওয়ার্ক করে নিতো। এতে কাজটা যেমন সহজ হতো, বাজেটও কমে যেত।”

সত্যজিৎ রায় ১৯৪৩ সালের এপ্রিল মাসে ডি জে কেমের (D.J. Keymer) নামক ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ‘জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার’ পদে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা ও ডিজাইনে তিনি সংযোজন করেন নতুন মাত্রা। একই সময়ে বইয়ের প্রচ্ছদ ও পত্রিকায় সিনেমা আঁকা শুরু করেন। এখানে তিনি বেতন পেতেন ৮০ টাকা। তিনি প্রথম বিজ্ঞাপনে ভারতীয় ধাঁচের ক্যালিওগ্রাফিক উপাদান ব্যবহার করা শুরু করেন। একই সাথে তিনি অক্ষরশৈলীতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাঁর নকশা করা দুটি ফন্ট ‘Ray Roman’ এবং ‘Ray Bizarre’ ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানে চিত্রসজ্জা’র কাজ তিনি আনন্দের সাথেই করতেন। এই সময় বিজ্ঞাপন সংস্থার ইংরেজ ও ভারতীয় কর্মচারীদের মধ্যে বেতনাদি নিয়ে চাপা উত্তেজনা চলছিলো। কারণ দেশী কর্মচারীদের তুলনায় ইংরেজ কর্মচারীদেরকে অনেক বেশি বেতন দেওয়া হতো। এই সময় তাঁর অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মী ডি.কে, দাশগুপ্ত ‘সিগনেট প্রেস’ নামক একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠিত করেন। গোড়া থেকেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চিত্রশিল্পী হিসাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ডি.কে. দাসগুপ্ত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন এবং এই গ্রন্থের চিত্রসজ্জার দায়িত্ব পড়ে সত্যাজিতের উপর। উল্লেখ্য, সত্যজিৎ তখন পর্যন্ত বাঙলা সাহিত্য ততটা পড়েননি। তাঁর প্রায় সকল পড়াশুনা ছিলো ইংরেজিতে লেখা উপন্যাস ও অন্যান্য গ্রন্থাদি। এমন কি তখনো রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোও তিনি বিশেষভাবে পড়েননি। এই অবস্থায় তিনি ‘পথের পাঁচালী’ পড়লেন এবং মুগ্ধ হলেন। ডি. কে দাশগুপ্ত এই প্রকাশনার কাজে আসার আগে একটি চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনিই প্রথম সত্যজিৎকে বলেন যে, ‘পথের পাঁচালী’ থেকে খুব ভালো একটি চলচ্চিত্র হতে পারে। এই প্রকাশনায় কাজ করার সুবাদে তিনি ব্যাপকভাবে বাঙলা গদ্য সাহিত্যের সাথে পরিচিত হন। যা তা পরবর্তী সময়ে বাঙলা উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশেষ সহায়তা করেছিলো।

সত্যজিৎ রায় এই সময় থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে চলচ্চিত্র দেখা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সাথে যোগাযোগ করে-নতুন মার্কিন চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়ে খবর নিতেন। বিশেষ করে নরম্যান ক্লেয়ার নামের রয়েল এয়ার ফোর্সের এক কর্মচারী এ বিষয়ে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে হলিউডে নির্মিত প্রচুর সিনেমা দেখানো হতো। এই সূত্রে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলো কলকাতার চলচ্চিত্র প্রেমিকদের কাছে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিলো। ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ এবং বংশীচন্দ্র দাশগুপ্ত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোসাইটিতে চলচ্চিত্র দেখানো হতো এবং এই বিষয়ে পরে ঘরোয়াভাবে আলোচনার ব্যবস্থা করা হতো। উল্লেখ্য এই সমিতি প্রথম প্রদর্শন করেছিলো Battleship Potemkin (১৯২৫ সালে রচিত নির্বাক চলচ্চিত্র। পরিচালক ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার Sergei Eisenstein)। ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ রেনোয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তার পরিচালিত ‘দ্য রিভার’ সিনেমার শুটিং প্রত্যক্ষ করেন সত্যজিৎ। চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশে ‘কনক পিকচার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এ সময় তিনি ‘এ পারফেক্ট ডে’ নামে রচনা করেন একটি চিত্রনাট্য। ১৯৫০ সালে চাকরির সূত্রে লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রায় ১০০ চলচ্চিত্র দেখেন। পরিচিত হন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ পেনেলোপি হাস্টন ও গ্যাবিন ল্যাম্বটির সঙ্গে। ইতালির ভিত্তোরিও ডি সিকা পরিচালিত ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালি’ অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। একই বছর অক্টোবরে দেশে ফিরে তিনি এর চিত্রনাট্য রচনা এবং ১৯৫২ সালে সিনেমার শুটিং শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালি নিউইয়র্কে প্রদর্শিত হয় এবং ওই বছর আগস্টে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। মুক্তির পর-পরই সিনেমাটি সারা বিশ্বে প্রশংসা লাভ এবং পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করে। সিনেমাটি পৃথিবীর বিভিন্ন শহর ও দেশ যথা-এডিনবার্গ, ম্যানিলা, স্পেন, সানফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ভ্যাঙ্কুভার, ডেনমার্ক ও জাপানে পুরস্কৃত হয়। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় সিনেমা অপরাজিত, এটি তাঁকে এনে দেয় নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। ১৯৫৬ থেকে ১৯৯২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র মিশেছিল তাঁর চিন্তা ও কর্মে। তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা দশ চলচ্চিত্রকারের মধ্যে একজন। তাঁর চলচ্চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্র, ৫টি তথ্যচিত্র ও ৩টি টেলিফিল্ম। এছাড়া তিনি বহু সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা ও সংগীত পরিচালনা করেছেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর জীবনকৃত্যের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।

এক সময় সত্যজিৎ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইংরেজি ও বাংলাতে চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রবন্ধ লেখাও শুরু করেন। ১৯৪৮-১৯৭১ এর মধ্যে রচিত এই প্রবন্ধগুলোর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে-Our Films, Their Films নামে। ইতিমধ্যে ইনি চিত্রনাট্য রচনায় বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজের আনন্দের জন্য চিত্রনাট্য লিখতেন এবং তার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। যে সকল সিনেমা তৈরি হবে, তার ঘোষণা পত্রিকায় আসার পরপরই, তিনি সেই ঘোষিত সিনেমার মূল উপন্যাস বা গল্প পড়ে নিজের মতো করে চিত্রনাট্য তৈরি করতেন। পরে ওই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলে, তিনি নিজের চিত্রনাট্যের সাথে তুলনা করে, তাঁর ক্ষমতা যাচাই করে নিতেন। এই সময় তাঁর বন্ধু হরিসাধন দাশগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে সিনেমা তৈরি করার জন্য বিশ্বভারতী থেকে অনুমোদন পান। সেই সূত্রে সত্যজিৎ ঘরে বাইরে উপন্যাসের চিত্রনাট্য রচনা করেন। কথা ছিল এই সিনেমার পরিচালনা করবেন হরিসাধন দাশগুপ্ত নিজে। কিন্তু সিনেমার প্রযোজকের এক বন্ধু এই চিত্রনাট্যের পরিবর্তনের জন্য বিশেষ পীড়াপীড়ি শুরু করলে, সত্যজিৎ এই চিত্রনাট্য আর হরিসাধনকে দেননি। প্রায় ৩৫ বছর পর সত্যজিৎ যখন ঘরে বাইরে সিনেমা তৈরিতে হাত দেন, তখন উপলব্ধি করেন যে, তাঁর পূর্বের চিত্রনাট্য অনুসরণে সিনেমাটি যে তৈরি হয়নি, সেটা নিঃসন্দেহে ভালো হয়েছিলো। ৩৫ বছর পর তাঁর মনে হয়েছিলো ওই চিত্রনাট্যটি ছিলো ‘হলিউডের ধাঁচে একজন অপেশাদারীর উদ্যোগ’। উল্লেখিত কারণে, সত্যজিৎ সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত হয়ে না উঠলেও, কলকাতার চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর নামটি বেশ সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলো। এই কারণেই ১৯৪৯ সালে যখন ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ রেনোর (Jean Renoir) তাঁর The River সিনেমা নির্মাণের জন্য কলকাতায় আসেন, তখন সত্যজিৎকে তাঁর সিনেমার চিত্রগ্রহণের উপযোগী স্থান খোঁজার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসাবে খুঁজে নিয়েছিলেন। এটাই ছিলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকারের সাথে তাঁর প্রথম পরিচয়। এই সময়ই তিনি রেনোর’র কাছে ‘পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে আলাপ করেন। রেনোর এই বিষয়ে বিশেষভাবে তাঁকে উৎসাহিত করেন। এবং অনেকে মনে করেন, বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের মৌলিক উপাদনগুলো সম্পর্কে রেনরো’র কাছ থেকে তিনি বিশেষ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৯৪৯ সালে সত্যজিৎ তাঁর দূর সম্পর্কের বোন ও বহুদিনের বান্ধবী বিজয়াকে বিয়ে করেন। তাঁদের বিয়ে ও প্রেমকাহিনীর কিছুটা তুলে না ধরলেই নয়। মানিক যখন সত্যজিৎ রায় হয়ে ওঠেননি তখন থেকেই বিজয়া তাঁর সঙ্গী। সবচেয়ে ভালো চেনেন তিনি সত্যজিৎকে। সম্পর্কে ছিলেন মামাতো ভাইবোন। প্রেম করেছেন টানা আট বছর। লুকিয়ে বিয়ে করেছিলেন। পরে অবশ্য বুদ্ধি করে দুই পরিবারকে রাজি করাতে পেরেছিলেন তাঁরা। আত্মজীবনী ‘মানিক এবং আমি’তে বিজয়া রায় নিজেই এসব কথা লিখে গেছেন। বইটা বের করেছিলো পেঙ্গুইন। বিজয়া রায় লিখেছেন, ‘কিশোরীকাল থেকেই মানিকের সঙ্গে আমার সখ্য। প্রেমটা শুরু ১৯৪০-এর দিকে। একসঙ্গে অনেক গান শুনতাম আমরা। সেগুলো নিয়ে আলাপ করতাম। ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকই বেশি শোনা হতো আমাদের। আমাদের আগ্রহের জায়গাটা ছিল একই, সিনেমা আর গান।’ দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন পরিবার থেকে বাঁধা আসবে। কারণ বিজয়া ছিলেন বয়সে সত্যজিতের চেয়ে বড়। তার ওপর আবার মামাতো বোন। একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুজনের কেউই বিয়ে করবেন না। যেভাবে চলছে জীবনটা সেভাবেই কেটে যাবে। এরপর সিনেমায় অভিনয় করতে মুম্বাইয়ে চলে যান বিজয়া। আর সত্যজিৎ থেকে যান কলকাতায় বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাজ নিয়ে। এ সময় দুজন চুটিয়ে প্রেমপত্র লিখতেন। বিজয়ার সাথে দেখা করতে প্রায়ই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কলকাতা থেকে মুম্বাই যেতেন সত্যজিৎ। ‘লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ’ রাখতে গিয়ে, বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিজেরাই পাল্টালেন। বুঝলেন সংসার না পাতলে আর হচ্ছে না। বিয়েটা তাহলে প্রাথমিকভাবে পালিয়েই করতে হচ্ছে। বিজয়া তাঁর মাকে ব্যাপারটা জানালেন। কিন্তু পালিয়ে বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি দিলেন না তিনি। মায়ের কথা শুনলেন বিজয়া কিন্তু কাজটা নিজেদের মতো করেই ফেললেন। ১৯৪৯ সালে বিজয়ার দিদির বাড়িতে বিয়ে হয় সত্যজিৎ আর বিজয়ার। আয়োজন ছোটখাটো হলেও সে সময় নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করতে এসেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পৃথ্বিরাজ কাপুর ও তাঁর স্ত্রী। বিজয়া লিখেছেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি মানিকের সঙ্গে আদৌ আমার বিয়ে সম্ভব। যখন ব্যাপারটা ঘটেই গেল, তখন আমরা দুজনেই সুখ এবং কষ্ট দুটোই অনুভব করছিলাম। কারণ বিয়ে করলেও বিষয়টা কাউকে জানাতে পারছি না, এমনকি একসঙ্গে থাকতেও পারছি না তখন আমরা।’ সত্যজিৎ আর বিজয়ার মিলনে এগিয়ে এলেন তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ডাক্তার নশো বাবু। সত্যজিৎ তাঁকে সব জানিয়ে দিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে বললেন। নশো বাবুর বুদ্ধিতেই শেষমেশ রাজি হলেন সত্যজিতের মা। কারণ সত্যজিৎ মাকে গিয়ে বলেছিলেন, বিয়ে করলে বিজয়াকেই করবেন, নচেৎ চিরকুমার থাকবেন। ছেলের জেদের কাছে মাকে হার মানতে হলো। ভাতিজি বিজয়াকেই পুত্রবধূ হিসেবে বরণ করে নিলেন তিনি। ১৯৪৯ সালেই আবার বাঙালি রীতিনীতি মেনে বিয়ে হয় বিজয়া আর সত্যজিতের। বিজয়া লিখেছেন, ‘আমার খুশি যেন বাঁধ মানছিল না। আমার বিশ্বাস ছিল মানিকের সাথে আমার কখনোই বিয়ে হওয়া সম্ভব না। ওর সাথেই কিনা আমার দুবার বিয়ে হয়ে গেল।’

১৯৪৯ সালে যখন ‘দ্য রিভার’ সিনেমার লোকেশন দেখতে ফরাসি নির্মাতা জ্যঁ রেনোয়া কলকাতায় এলেন, তখনই সত্যজিতের জীবনের মোড় ঘুরে গেল। জ্যঁ রেনোয়াকে নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছিলেন সত্যজিৎ। রেনোয়া তাঁকে বলেছিলেন, হলিউডকে পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো করে সিনেমা বানাতে। পরে সত্যজিৎ বিভিন্ন সময়ে বলেছিলেন, তাঁর সিনেমার ক্যারিয়ারের পেছনে রেনোয়ার অবদান অসামান্য। রেনোয়া তাঁর সিনেমায় সত্যজিতের বন্ধু বংশী চন্দ্র গুপ্তকে শিল্প নির্দেশক এবং সহযোগী হিসাবে নেন হরিসাধন দাশগুপ্তকে। এই সিনেমায় সুব্রত মিত্রও ছিলেন। পরে ইনি সত্যজিৎ -এর সিনেমায় সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করেছেন। এই সিনেমায় কাজ করার জন্য সত্যজিতের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তিনি তখনও বিজ্ঞাপন সংস্থায় শিল্প নির্দেশক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এই সংস্থা সত্যজিৎকে তাদের লণ্ডনস্থ প্রধান অফিসে কাজ করার জন্য পাঠান। সত্যজিৎ এই কাজের জন্য জাহাজযোগে সস্ত্রীক লন্ডনে যান ১৯৫০ সালে। জাহজে যেতে তাঁদের ১৬ দিন সময় লেগেছিলো। এই সময়ে তিনি ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা কিভাবে তৈরি করবেন, তার খসড়া তাঁর নোট বইতে লিখা শুরু করেন। ‘পথের পাঁচালী’ তৈরিতে তিনি কোন দিকনির্দেশনা অনুসরণ করবেন, সে সম্পর্কে এই নোট বই থেকে জানা যায়। তিনি এক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এগুলো হলো-তাঁর সিনেমার চিত্রায়ণ হবে বাস্তব কোন অঞ্চলে, নতুন মুখ নেবেন এবং কোনো মুখসজ্জা (make-up) থাকবে না। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রায় শ’খানেক চলচ্চিত্র দেখেন। এর ভিতরে ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী সিনেমা লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে (ইতালীয় Ladri di biciclette ইংরেজি Bicycle Thieves (সাইকেল চোর) দেখেন। এই সিনেমাটি তাঁকে ‘পথের পাঁচালী’ তৈরিতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলো। কারণ, তাঁর বাস্তববাদী চলচ্চিত্র দর্শকরা গ্রহণ করবে কিনা এ নিয়ে তাঁর যথেষ্ঠ সংশয় ছিলো। এক্ষেত্রে তাঁর পরিচিত অনেকেই এই জাতীয় সিনেমা তৈরিতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। এমন কি এই সিনেমা তৈরি করার প্রারম্ভিক মুহূর্ত থেকে শুরু করে মুক্তি পাওয়ার পূর্বকাল পর্যন্ত অনেকেই এই সিনেমার সাফল্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এবং তা সত্যজিতের কাছে দৃঢ়ভাবে প্রকাশও করেছিলেন। Bicycle Thieves সিনেমা দেখার পর তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সিনেমা সফলতা পাবেই।

এ সময় সত্যজিৎ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নব্য-বাস্তবাবাদী ধারার সিনেমা তৈরি করবেন। তিনি তাঁর Our Films, Their Films গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন-‘All through my stay in London, the lessons of Bicycle Thieves and neo-realist cinema stayed with me.’ এই সিনেমা দেখেই তিনি তাঁর জাহাজে লিখিত নোট বইয়ের সিদ্ধান্তকে (বাস্তব স্থান এবং মুখসজ্জা ছাড়া নতুনমুখ) দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এবং জাহাজে করে ফেরার পথে, ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি কাগজ-কলমে সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। ১৯৫০ সালের শেষের দিকে তিনি কলকাতা ফিরে এসে একজন প্রোডিউসারের সন্ধান করতে থাকেন। ইতিমধ্যে তিনি নতুন মুখও খুঁজতে শুরু করলেন। এ সিনেমা বানানোর জন্য তিনি কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন কুশলীকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। এর ভেতরে পূর্ব-অভিজ্ঞতা আছে এমন কিছু লোককে রাজি করালেন। এঁদের ভেতরে ক্যামেরাম্যান হিসাবে সুব্রত মিত্র ও শিল্প নির্দেশনায় বংশী চন্দ্রগুপ্তকে নিলেন। এঁরা দুজনই ইতিমধ্যে রেনোর দ্য রিভার সিনেমায় কাজ করে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এঁদের সাথে অনিল চৌধুরী যুক্ত হয়েছিলেন প্রোডাক্শন কন্ট্রোলার হিসাবে।

সিনেমা তৈরিই জন্য ‘পথের পাঁচালী’র লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধবা স্ত্রী’র কাছ থেকে অনুমতি নেন। তিনি সত্যজিৎকে বিনাশর্তেই অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও সত্যজিৎ তাঁকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এই সিনেমার জন্য তিনি চিত্রনাট্যের পাশাপাশি বহু সিনেমা এঁকেছিলেন। অনেকেই তাঁর এই কর্মোদ্যমকে প্রশংসা করেছিলেন বটে, কিন্তু সিনেমা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করতে রাজি হননি কেউই। সিনেমা স্টুডিওকে পরিহার করে বাস্তব স্থানে চিত্রায়ণ, মুখসজ্জা ছাড়া নতুন মুখ-এই ধারণাকে অনেকে সমালোচনাও করেছিলেন এবং তাঁর আর্থিক অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তগুলো বিশেষভাবে প্রতিবন্ধকতারও সৃষ্টি করেছিলো। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর জমানো টাকা, বীমা কোম্পানি থেকে গৃহীত ঋণ এবং কতিপয় বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় ১৯৫২ সালের শেষ দিকে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি তখনও ডি.জে. কেমার বাণিজ্যিক সংস্থায় কাজ করতেন। ফলে রবিবার ছুটির দিনে চিত্রগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবরে তিনি প্রথম চিত্রগ্রহণ শুরু করেন। এটি ছিলো ‘অপু’ এবং তাঁর বোন ‘দুর্গা’ কাশবনের ভেতর দিয়ে রেলগাড়ি দেখতে ছুটছে-অংশের দৃশ্য। পরের সপ্তাহে চিত্রগ্রহণ করতে এসে দেখলেন, গ্রামের গবাদি পশু মাঠের কাশবন খেয়ে মাড়িয়ে তছনছ করে দিয়ে গেছে। ফলে এই দৃশ্যের ধারাবাহিকতা রাখার জন্য তাঁকে চিত্রগ্রহণ করতে হয়েছিলো প্রায় এক বছর পর।

এই সময় বিমল রায় এই ধরনের একটি বাস্তবাদী সিনেমা তৈরি করেছিলেন। সিনেমাটির নাম ছিল দো বিঘা জমিন। এই সিনেমায় কয়েকটি গান ছিল এবং প্রধান চলচ্চিত্রধারার পেশাদার অভিনেতারা কাজ করেছিলেন। এই ধারার দুটি সিনেমা (Do Bigha Jamin ও Kurosawa’s Rashoman) ১৯৫৪ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে Prix International পুরস্কার লাভ করে। এই প্রাপ্তি থেকে তিনি তাঁর কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৫৩ সালে আনা দত্ত নামক একজন প্রোডিউসার তাঁকে কিছু টাকা দিয়ে জানালেন যে, তাঁর শেষ সিনেমা যদি ভালো চলে, তবে তিনি এই সিনেমায় বাকি টাকা দেবেন। এরপর সত্যজিৎ একমাস টানা কাজ করেছিলেন অফিস থেকে বেতন ছাড়া ছুটি নিয়ে। কিন্তু আনা দত্তের শেষ সিনেমা ভালো ব্যবসা না করায়, তিনি আর টাকা দিলেন না। তারপরেও কিছু সংগৃহীত টাকা এবং স্ত্রী বিজয়া রায়ের স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে কিছুদিন শুটিং করেছিলেন। এইসব আর্থিক অসুবিধার কারণে, থেমে থেমে এই সিনেমা তৈরি করতে তাঁর প্রায় দীর্ঘ তিন বছর লেগে গিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে সিনেমাটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় ও সে বছরের ২৬ আগস্ট তারিখে সিনেমাটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই সিনেমাটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে। সিনেমাটি বহুদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এবং ভারতের বাইরে প্রদর্শিত হয়। এই সিনেমার সাফল্যের পর তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি ১৯৫৬ সালে তৈরি করেন অপরাজিত। এই সিনেমা তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁকে উচ্চাসনে পৌঁছে দেয়। এই সিনেমার জন্য তিনি ভেনিসে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার লাভ করেন। ‘অপু-ত্রয়ী’ শেষ করার আগে সত্যজিৎ আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সমাপ্ত করেন। প্রথমটি ছিলো ১৯৫৮ সালে নির্মিত পরশ পাথর (১৯৫৮), আর পরেরটি ছিলো জলসাঘর (১৯৫৮)। এরপর ‘অপু-ত্রয়ী’র শেষ অপুর সংসার তৈরি করেন ১৯৫৯ সালে।

আন্তর্জাতিকভাবে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবেই সর্বাধিক পরিচিত। কারণ, তাঁর সৃষ্ট ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছিলো, এদের মধ্যে অন্যতম ছিলো কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া ‘শ্রেষ্ঠ মানব দলিল’ (Best Human Document) পুরস্কারটি। ‘পথের পাঁচালি’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’–এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে ‘অপু-ত্রয়ী’ বলা হয়, এর জন্য তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বা ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে বহুল স্বীকৃত।

বাঙলা ভাষাভাষীদের কাছে চলচ্চিত্রকার ছাড়াও আরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় হলো লেখক সত্যজিৎ। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর, পিতা সুকুমার রায় বাঙলা সাহিত্যে যে বিশিষ্ট ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায় সে ধারাকেই প্রবাহিত করেছেন একটু ভিন্নখাতে। পিতামহ ও পিতা ছিলেন শিশুর জগতে, সত্যজিৎ সে জগতকে টেনে তুলেছিলেন কিশোর জগতে। তাঁর বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, গোয়েন্দা গল্পের ফেলুদা সিরিজ এবং সে সাথে নানাবিধ মজাদার গল্পগুলো কিশোরদের জন্য লিখিত হলেও সব বয়সের মানুষকে দারণভাবে টানে।

১৯৮৩ সালে ঘরে বাইরে সিনেমার কাজ করার সময় সত্যজিতের হার্ট অ্যাটাক ঘটে এবং এ ঘটনার পর অবশিষ্ট নয় বছরে তাঁর কাজের পরিমাণ ছিলো অত্যন্ত সীমিত। স্বাস্থ্যগত কারণে ঘরে বাইরে নির্মাণের সময় তাঁর ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের সহায়তায় নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য ১৯৮৪ সালে সিনেমাটি সমাপ্ত করেছিলেন। এই সিনেমায় তিনি পাশ্চাত্য রীতির চুম্বন দৃশ্য যুক্ত করেছিলেন। এরপর থেকে তাঁর ছেলে সন্দীপ রায় তাঁর হয়ে ক্যামেরার কাজ করতেন। ১৯৮৭ সালে সত্যজিৎ তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে সত্যজিৎ তাঁর শেষ তিনটি সিনেমা বিশেষ যত্ন নিয়ে করতে পারেননি। এই সিনেমা তিনটি হলো-গণশত্রু (১৮৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯০)।

কিংবদন্তি বাঙালি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে নিন্দুকদের অনেক বড় অভিযোগ-সমকালীন রাজনীতি সবসময়ই অনুপস্থিত ছিলো তাঁর সিনেমায়। কিন্তু তাঁর ‘তিন কন্যা’ দিয়ে অভিনয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা অপর্ণা সেন জানাচ্ছেন ভিন্ন কথা। খ্যাতনামা এই অভিনেত্রী ও নির্মাতা জানান, ১৯৫৮ সালে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভিক্ষ দূরীকরণ কমিটি, কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য বাম দলগুলোর আন্দোলনকে সমর্থন করতেন সত্যজিৎ, যার ছাপ তাঁর সিনেমাগুলোতেও দেখা যায়। তিনি বলেন,“‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর ‘ওরে বাবা দেখ চেয়ে’ গানের পটভূমিতে ক্ষুধার্ত সৈন্যদের মিছিলের পর ‘অশনি সংকেত’-এ দুর্ভিক্ষপীড়িত গ্রামের মানুষদের শহরের দিকে যাত্রাটা কিন্তু আরও বড় হয়েছিল।” অপর্ণা’র বক্তব্যে ১৯৭১ সালের সিনেমা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র কথাও উঠে আসে। অপর্ণা মনে করেন নকশালবাড়ি আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়টাকে ফ্রেমবন্দী করাতে সত্যজিৎ-এর সেটাই ছিলো ‘সত্যিকারের প্রয়াস’। তিনি বলেন, “সমস্যটা হলো, সিদ্ধার্থ (সিনেমার মূল চরিত্র, যার ছোটভাই একজন নকশালপন্থী) সত্যজিৎ-এর মতোই প্রশাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও এর সম্ভাব্য সমাধানগুলোর উল্টোপিঠও দেখতে পেতো। সিদ্ধার্থের মতোই সত্যজিৎ নিজেও জানতেন না, সমাধানটা আসলে কী; এরপরও ওইসময়কার যুবসমাজের প্রতি ছিল তার গভীর সহানুভূতি, যাদের আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা ছিলো না।” অপর্ণা আরও বলেন, ‘ক্যারিয়ারজুড়েই নানান সিনেমার মাধ্যমে সত্যজিৎ মৃত্যুকে এক অনন্য উপায়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাঁর দর্শকদের সঙ্গে।’

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রের কালানুক্রমিক তালিকা: পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপারিজত (১৯৫৬), পরশপাথর (১৯৫৮), জলসাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), তিনকন্যা [পোষ্টমাস্টার, মনিহার, সমাপ্তি] (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১), কাঞ্জনজঙ্ঘা (১৯৬২) , অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪) টু (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী গাইন বাঘ, বাইন (১৯৬৮), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), সিকিম (১৯৭১), The Inner Eye (১৯৭২), অশনী সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), জন অরণ্য (১৯৭৫), বালা (১৯৭৬), সতরঞ্জী কে খিলাড়ি (১৯৭৭), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), পিকু (১৯৮০), সদগতি (১৯৮১), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), সুকুমার রায় (১৯৮৭), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা-প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)।

১৯৯২ সালে এপ্রিলের প্রথমদিকে হৃদরোগ প্রকট আকার ধারণ করলে সত্যজিৎ রায় হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যুর কিছু সপ্তাহ আগে অত্যন্ত অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি তাঁর জীবনের শেষ পুরস্কার সম্মানসূচক অস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন আজও তাঁর অমর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে।

সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকীর প্রবেশদ্বারে আনন্দবাজারের জন্য কলম ধরেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ‘এই কঠিন সময়েও মানিকদা আশা হারাতেন বলে মনে হয় না’ শিরোনামের রচনায় (দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ মে, ২০২০) গভীর প্রত্যয়ে বলছেন তিনি, “সিনেমার ভাষা আগামী দিনে যতই বদলে যাক, তাতে সত্যজিতের সিনেমার গুরুত্ব কখনওই কমবে না।শিল্পের বদল তো ঘটেই। সেটা তো ভালো কথা। চলচ্চিত্র, শিল্পকলা, নাটক, সাহিত্য, কবিতা—সবক্ষেত্রেই নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এসে সেই শিল্প মাধ্যমকে সমৃদ্ধ করেছে। তাতে ক্ষতির কিছু নেই। খুব কাছ থেকে দেখেছি বলে আমি জানি,সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন আশাবাদী শিল্পী। তাঁকে কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি, আশাহত হতে দেখিনি। নানা বাধা পেরিয়েই তিনি তাঁর সিনেমা করে গিয়েছেন। সে সবের ছাপ কিন্তু ওঁর সিনেমায় পড়তে দেননি। সিনেমাগুলি দেখে আজ সে সব বোঝাও সম্ভব নয়। তাঁর সমস্ত সিনেমা নিয়ে যদি কেউ মূল্যায়ন করতে বসে, তবে সে ওঁর এই আশাবাদী দিকটি বুঝতে পারবে। ‘পথের পাঁচালী’ থেকে যার শুরু। ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় আসন্ন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি থাকলেও সেই সিনেমা শেষ অবধি নিরাশার কথা বলে না। ‘মহানগর’-এও সেই আশা, নতুন করে বাঁচবার আশা। ‘হীরক রাজার দেশে’ শেষে ‘দড়ি ধরে মারো টান’ দর্শককে উজ্জীবিত করে। ‘গণশত্রু’র শেষেও তাই। একটা মিছিলের শব্দ, যা এগিয়ে আসছে চিকিৎসক অশোক গুপ্তর সমর্থনে। আবার ‘আগন্তুক’-এ যেখানে মানুষ ভয়ঙ্কর এক সভ্যতাকে গড়েছে, মাদকদ্রব্য, পরমাণু বোমা ইত্যাদিতা নিয়ে কথা হচ্ছে, সেখানেও সত্যজিৎ রায় একেবারে আশা হারিয়ে বসে আছেন তা কিন্তু নয়। একটা শব্দ, ‘ফ্লক্সিন সিনিহিলি ফিলিপিকেশন’ যা দিয়ে সভ্যতার অসারত্ব তিনি কত সহজে বুঝিয়ে দেন। কিন্তু মানুষে-মানুষে আত্মিকযোগই যে তাঁর সবথেকে বড় পরিচয় তার চিহ্ন রেখে দেন মনমোহনের সম্পত্তি দানের চিঠির মধ্যে দিয়ে।”

বিশ্বনন্দিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উদযাপন লগ্নের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাবাকেই যেন খুঁজছেন তাঁরই সন্তান সন্দীপ রায় তার নানা রচনায়। অবরুদ্ধ করোনাকালে স্মৃতির জানালা খুলে জানাচ্ছেন, ‘এ কোন সময়?’ ‘অশনি সংকেত’! সন্দীপ খুলে ফেললেন ‘অশনি সংকেত’-এর চিত্রনাট্যের খাতা। “বাবার মনে হয়েছিলো হয়তো, শহর নিয়ে অনেক সিনেমা হলো। এবার গ্রামে ফিরে যাই। ‘অশনি সংকেত’ কালার হওয়ায় সমালোচকেরা বলেছিলেন, এই বিষয়ের সিনেমা কেন কালার হলো? বাবা বলেছিলেন, ‘বাইরের প্রকৃতি রঙিন। ঝলমলে। মানুষের খিদে সে বুঝছে না।’ আজও তো তাই। বসন্ত, গ্রীষ্ম তরতাজা, অথচ চারিদিকে মৃত্যু মিছিল।” (দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২০)। আর অভিনেতা দীপঙ্কর দে লিখেছেন, ‘গভীর দর্শনও কত সহজ ভাবে বলা যায়, মানিকদা দেখিয়েছেন’। স্মৃতিচারণ করে তিনি (দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ মে, ২০২০) লিখেছেন, “আমি মানিকদার সঙ্গে পাঁচটি সিনেমায় কাজ করেছি। ‘সীমাবদ্ধ’য় ছোট একটা দৃশ্যে অভিনয় দিয়ে শুরু করে ‘জনঅরণ্য’, ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’, ‘আগন্তুক’। মানিকদার শৈল্পিক ভাবনাচিন্তা প্রথম দিকে যেমন ছিলো, শেষ দিকেও তেমন। একই ছিলো। শেষের দিকে শারীরিক কারণে একটু ইনডোর নির্ভর হয়ে পড়েছিলেন। আউটডোরেযেতে পারতেন না। কিন্তু সেখানেও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সমস্ত ছকা থাকতো। সবরকম প্রস্তুতি নিয়েই কাজ শুরু হতো।”

সোমেশ্বর ভৌমিক লিখেছেন, ‘শিক্ষানবিশের পাঠক্রম’ শিরোনামের রচনায় (দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মে, ২০২০) ‘শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরির বই মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিলো’। সত্যজিৎ হয়ে ওঠার পথ পরিক্রমার নিবিড় পর্যৃবেক্ষণ করে তিনি জানাচ্ছেন, “শান্তিনিকেতনের শিক্ষা সম্পূর্ণ করেননি তিনি। কলকাতায় জাপানি বোমা পড়বে, এই ভয়ের আবহে ফিরে আসেন ভবানীপুরের বাড়িতে। কিন্তু এই শান্তিনিকেতনেই সত্যজিৎ পেলেন এক অমূল্য রত্নভাণ্ডারের সন্ধান। স্কুলজীবন থেকে সুপরিচালিত, সু-অভিনীত ও সু-বিজ্ঞাপিত হলিউডি সিনেমা দেখে বেড়ে-ওঠা, তারকা প্রথা আর স্টুডিয়ো-ব্যবস্থার গুণগ্রাহী তরুণ সত্যজিতের সামনে খুলে গেলো সিনেমা আস্বাদনের এক বিকল্প পথ। কী সেই রত্নভাণ্ডার? শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগার। এখানে সত্যজিৎ খুঁজে পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র বিষয়ে কয়েকটি বই: মার্কিন চলচ্চিত্র-বিশেষজ্ঞ লিউইস জেকব্স-এর দ্য রাইজ় অব দি আমেরিকান ফিল্ম (১৯৩৯); সোভিয়েট পরিচালক স্বেভোলোদ পুদভকিন-এর তাত্ত্বিক লেখার ইংরেজি অনুবাদ পুদভকিন অন ফিল্ম টেকনিক (১৯৩০) আর ফিল্ম অ্যাক্টিং (১৯৩৯), অনুবাদক আইভর মন্টেগু; ব্রিটিশ চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ পল রোথা’র দ্য ফিল্ম টিল নাউ (১৯৩০) আর ডকুমেন্টারি ফিল্ম (১৯৩৯); অন্য এক জন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ রেমন্ড স্পটিসউড-এর আ গ্রামার অব দ্য ফিল্ম: অ্যান অ্যানালিসিস অব ফিল্ম টেকনিক (১৯৩৫), জার্মান মনস্তত্ত্ববিদ ও চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক রুডল্ফ আর্নহেইম-এর ফিল্ম (অথবা ফিল্ম অ্যাজ় আর্ট)-এর ইংরেজি অনুবাদ (১৯৩৩), অনুবাদক এল এম সিয়েভকিং ও ইয়ান এফ ডি মরো। বইগুলোর লেখক এবং প্রতিপাদ্য বিষয়ের ব্যাপারে একটু খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।”

আলোকচিত্র

সত্যজিৎ রায়

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট