৩ জুন ২০২০

...
...


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা

লেখক: আহমদ সফি উদ্দিন

তারিখ: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯



‘শালে তুম জানতে নেহি বাঙ্গাল আদমি সে কুত্তা ভি বহুত আচ্ছা হ্যায়। কুত্তাকা সাথ রাহনে সে বাঙ্গাল কা লাশ পাক হো জায়েগা। জলদি কর শালা’- বলেই আমার পিঠে মারল রাইফেলের বাঁটের প্রচণ্ড আঘাত। ১৫ হাত লম্বা ও ৫ হাত চওড়া সুগভীর একটি গর্তের সামনে আমি দাঁড়িয়ে। এ কী দেখছি আমি। গর্তটি ভর্তি হয়ে গেছে গলাকাটা মানুষের লাশের স্তূপে। চোখ, হাত-পা বাঁধা লাশগুলোর। রাতে তাদের জবাই করেছে হানাদার বাহিনীর পশু সৈন্যরা। তখনো মাটি চাপা দেওয়া হয়নি। যুবকের সংখ্যাই বেশি। একজনের পকেটে তখনো রয়েছে সুন্দর দামি কলমটি। গুলি করে মারা কুকুরগুলোকে লাশভর্তি গর্তে ফেলে দেওয়ার জন্য অন্যকে নির্দেশ দিচ্ছিল ওরা। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোয় এমনই ভয়াল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মোসলেম উদ্দিন শাহ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই গণহত্যার বিবরণ সংগ্রহ করেছিলাম প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে। দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে গণকবর খনন করে ছবি তুলেছিলাম। দৈনিক বাংলায় তা ছাপাও হয়। সেখানকার কয়েকটি দেহাবশেষ আজও সংরক্ষণ করা হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলের উত্তর-পূর্ব দিকের বিস্তীর্ণ প্রান্তর এবং জলাভূমির প্রায় এক বর্গমাইল এলাকা পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে। যুদ্ধের নয় মাস ধরে প্রতিদিনই এখানে হত্যা করা হয়েছে ছাত্র, যুবক, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধাসহ শত শত মানুষকে। এ বধ্যভূমিতে নিহতের সংখ্যা তিন হাজার বলে অনুমান করা হয়। স্বাধীনতার পর একটি মাত্র গণকবর খুঁড়েই পাওয়া যায় ২৩টি মাথার খুলি। এমন প্রায় দেড়শ গণকবর ওই এলাকায় রয়েছে বলে স্থানীয় জনসাধারণের ধারণা। আশপাশের গ্রামের লোক দিয়ে জোর করে এসব বিরাট কবর খুঁড়িয়ে নেওয়া হতো।

স্বাধীনতার পূর্বদিন পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ শামসুজ্জোহা হল ব্যবহৃত হয়েছিল হানাদার বাহিনীর রাজশাহী জেলার প্রধান ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে অপারেশন হেডকোয়ার্টার রূপে। বন্দিশালা, নির্যাতনকক্ষ সবই ছিল এখানে। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের পাশে হওয়ায় প্রতিদিন এখানে ট্রেনে করে দূরদূরান্ত থেকে ধরে আনা হতো মুক্তিবাহিনী আর নিরীহ বাঙালি সন্তানদের। শান্তিকমিটি আর আলবদর প্রতিনিধিসহ বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে প্রহসন হতো। তারপর মৃত্যুদ-ই ছিল একমাত্র শাস্তি।

বলিদণ্ডে জবাই:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাতে বন্দিদের হাত ও চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো বধ্যভূমিতে। তার পর গর্তের মধ্যে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে মেশিনগান চালানো হতো গর্তের দিকে তাক করে। তার পর চাপা দেওয়া হতো মাটি। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস থেকে বদলে গেল হত্যাপদ্ধতি- যখন ওরা জানতে পারল গুলি খেয়েও অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

রাজশাহীর দৈনিক আজাদ প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদসহ ১৩ জনকে গর্তে ফেলে সেখানে মেশিনগানের গুলিতে হত্যার পর চাপা দেওয়া হলো মাটি। তবু আহত হয়ে চাপা দেওয়া মাটি সরিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন রাজশাহীর পদ্মাতীর সংলগ্ন মাদার বখ্শ মিলনায়তনের পিওন কাদের। রোজ রোজ গুলির শব্দের দরুন হত্যাযজ্ঞের কথাও বাইরে রটতে লাগল। তাই শুরু হলো জবাই পদ্ধতিতে গণহত্যা। কখনো ধারালো তরবারি আবার কখনো রামদা দিয়ে কোপ দিয়ে বাঙালি নিধন চলল। বলিদণ্ডও তৈরি করা হয়েছিল, যার ওপর বন্দিদের মাথা রেখে জবাই করা হতো (স্বাধীনতার পার জোহা হল থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়)। অক্টোবর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিফোন অপারেটর শামসুল আলম সরদারকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে একদিন ১১টি গলাকাটা লাশ টেনে নিয়ে কবরস্থ করতে বাধ্য করেছিল হানাদার সেনারা।
নৃশংস বন্দিশালা:

জোহা হলে বন্দিদের কঠোর নির্যাতন করা হতো। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের সব শরীরের চামড়া উপড়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বৈদ্যুতিক শক্ দিয়েও কথা আদায়ের চেষ্টা হতো। ছটফট করে শেষ শয্যায় ঢলে পড়েছে কত বাঙালি সন্তান। জোহা হলে বন্দি জীবনযাপনকারী অ্যাডভোকেট আতাউর রহমানের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা : ‘আমাদের খেতে দেওয়া হতো ধান কাঁকরসহ চাল আর ছোলা সেদ্ধ। ঘরের মেঝে ছিল প্লেট। প্রস্রাবের সময়কাল আধমিনিটের বেশি হলে পিঠে পড়ত বুটের লাথি। পা উপরে ঝুলিয়ে বন্দিদের বাঁশপেটা করা হতো, মারা হতো চাবুক। রোজই গভীর রাতে ১০ থেকে ৩০ বন্দিকে বন্দিশালা থেকে নিয়ে যাওয়া হতো বধ্যভূমিতে। রাজশাহীর আবুল হোসেন মোক্তার, অ্যাডভোকেট তসলিম উদ্দীন, নবাবগঞ্জ কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ও শান্তাহার রেলস্টেশনের জনৈক ডাক্তারসহ ১৭ বন্দিকে হত্যা করা হয় ঈদুল ফিতরের পূর্ব দিন ১৯ নভেম্বর। কয়েক দিন পর নোয়াখালীর ভবানীগঞ্জের আব্দুল মান্নান, রাজশাহীর টিকাপাড়ার রিকশাচালক মীর আশরাফ আলী, পবা থানার মুক্তিফৌজ মহসীন আলী, তার পিতা আবু বকর ও বাগমারার আব্দুর রহমানকে হত্যা করা হয় ডেকে নিয়ে গিয়ে। এদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেছিল আলবদররা।
মেয়েরাও রেহাই পায়নি:

বর্বর হানাদারদের হাত থেকে বাঙালি মেয়েরাও রেহাই পায়নি। স্বাধীনতার পর একটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে কাজল, টিউব, কানের দুল, ওড়না, কামিজের কাপড় প্রভৃতি দেখে তার প্রমাণ মেলে। প্রায়ই জোহা হলের ভেতর থেকে নারীকণ্ঠের আর্তচিৎকার ভেসে আসত। পাশবিক নির্যাতন চলত তাদের ওপর। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দিন আগে জোহা হলের দক্ষিণের খেজুর গাছতলায় পড়ে ছিল এক মহিলার লাশ। টিনশেড মতিহার হলের একটি বাথরমের ভেতরে ১১ বছরের এক মেয়ের কংকাল স্বাধীনতার পরও পড়ে থাকতে দেখা যায়।

প্রথম রক্তের বন্যা:

২৫ মার্চ রাতেই সামরিক বাহিনী প্রবেশ করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রশাসন ভবনের নাইটগার্ড আব্দুর রাজ্জাককে হত্যা করল। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। অচিরেই মুক্ত হলো রাজশাহী আবার। কিন্তু ১৩ এপ্রিল কর্নেল তাজের নেতৃত্বে এক ব্রিগেড সৈন্যসহ রাজশাহী পুনর্দখল করল হানাদার বাহিনী মেশিনগান, মর্টার আর রকেট লঞ্চারের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে। নাটোর থেকে রাজশাহীর পথে বহু স্থানে প্রতিরোধ দিয়েও মুক্তিবাহিনী টিকতে পারেনি আধুনিক অস্ত্রের সামনে। হানাদাররা পথের দুপাশের অসংখ্য গ্রাম ভস্মীভূত করতে করতে দখল নিয়েছিল রাজশাহীর। পরে জোহা হল হলো ক্যান্টনমেন্ট। রাজশাহীর রাস্তাঘাটে সেদিন রক্তের বন্যা বয়েছিল। পদ্মার চর দিয়ে ওপারে পালিয়ে যাওয়ার পথে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করা হয়েছিল শত শত লোককে। সাহেববাজার এবং নিউমার্কেট ভস্মীভূত করা হলো।

বর্বর হানাদার বাহিনী হত্যা করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্ক বিভাগের প্রফেসর হবিবুর রহমান, ভাষা বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মীর আব্দুল কাইয়ুম, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মো. আফজাল, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল ওয়াহাব, কোরবান আলী, মোহন লাল, আব্দুল মালেক, নুরু মিয়া, ওয়াজেদ আলী, এমাজ উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, কলিমুদ্দিন, শফিকুর রহমান, আবুল আলী ও আব্দুল মজিদকে। হত্যা করেছিল বহু ছাত্রকে।
তালাইমারীর বধ্যভূমি:

জোহা হলে ধরে নিয়ে যাওয়া বন্দিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে তালাইমারীর সামরিক ক্যাম্পের কাছে পদ্মার তীরেও হত্যা করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রিভিয়াসের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক টিয়া রেকি করতে এসে ধরা পড়েন ৫ আগস্ট। ১৭ তারিখে পদ্মার তীরের মসজিদের কাছে অন্য ৫ বন্দিসহ তার সর্বশরীরে বেয়নেট চার্জ করা হয়। জনৈক রিকশাচালক অর্ধমৃত অবস্থায় পদ্মা নদী থেকে তার দেহ উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। কিন্তু সেখানেও ছোবল মারে হানাদারদের দোসররা। ১৯ আগস্ট ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩ নম্বর বেড থেকে হানাদাররা পুনরায় ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে তাকে।

পোড়ানো হয় লক্ষ লক্ষ টাকা:

৯ মাস ধরে কর্নেল তাজ, মেজর ইকবাল, মেজর শেরোয়ানী, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, মেজর ইমতিয়াজ প্রমুখ দখলদার বাহিনীর নরখাদক অফিসারদের হুকুমে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। এদের নির্দেশে রাজশাহীর আশপাশের প্রতিটি থানায় চালানো হয়েছে ধ্বংসাত্মক অভিযান। হেলিপোর্ট পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছিল সামরিক কাজে। আত্মসমর্পণের মাত্র একদিন আগে রাজশাহীর সব ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা পোড়ানো হয়েছে জোহা হলের মাঠে। জোহা হল হলো মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী শিবির। এখানে প্রাপ্ত সবরকম অস্ত্র ২০টি ওয়াগনে ভর্তি করে নিয়ে যেতে হয়।

গণহত্যা জাদুঘর চাই:

সরকারী উদ্যোগে রাবি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যার ওপর কোনো গবেষণা হয়নি। একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও হতে পারত। আমরা বিভিন্ন সময় জোহা হলে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা জাদুঘর স্থাপনের দাবি জানিয়ে এসেছি। কিন্তু কোনো প্রশাসন তা করেনি।
পাকিস্তান সামরিক জান্তার সেনাবাহিনীর বেয়নেটের আঘাতে প্রথম নিহত বুদ্ধিজীবী শহীদ ড. জোহার নামানুসারে নির্মিত শহীদ শামসুজ্জোহা হল ওরা অপবিত্র করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল চত্বর হয়েছিল বধ্যভূমি।
লেখক: আহমদ সফি উদ্দিন, সাংবাদিক ও গবেষক।

আলোকচিত্র

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট