৩ জুন ২০২০

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৬)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ২৩ নভেম্বর ২০১৭



পড়াশুনার একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে ছিল বলে সেন্ট জোসেফস স্কুলে ভর্তির কথাই কেবল ভেবেছি। থাকার জায়গাসহ আনুষঙ্গিক আর কোন কিছুর কথা ভাবি নাই। আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এগুলোর বিরুদ্ধে। এত অল্পবয়সে প্রতিকূল অবস্থার ভেতর সামনে এগিয়ে যাওয়ার এই অতি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেয়েছি যা আমার জন্য একটা অমূল্য সম্পদ। এইসব প্রতিকূল অবস্থা আমাকে মানুষ হিসেবে আরো শক্তিশালী করেছে।

এডভোকেট আবুল কাশেম সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় পাওয়াটা আমার প্রথম সাচ্ছন্দ্য। আমি আস্তে আস্তে আমার আত্ম সম্মানবোধ ফিরে পেয়েছি। আমি ঠিক এই সময় থেকে শহরমুখী হতে শুরু করেছি। দশম শ্রেণীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও গ্রামের বাড়িতে যাবার প্রচণ্ড টান ছিল। এই টানের কারণে একবার খুলনার লঞ্চঘাটে গিয়েছিলাম গ্রামের কারো সাথে যদি দেখা হয়, আর কিছু নয়। মনে হচ্ছিলো ২টার সময় বাড়ির দিকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চে উঠে পড়ি। লঞ্চ ভাড়ার ২ টাকা ছিল না বলে তা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার রাত সামনে। লজিং মাস্টারকে বলে ৪টার দিকে পাঁয়ে হেটে ২০ মাইল দূরে বাড়ির দিকে রওনা দেই। পথে রাত ৮ টার দিকে এক মরা পোড়ানো শ্মশান ঘাট পার হচ্ছিলাম। চাঁদের স্বল্প আলোয় হটাৎ মনে হচ্ছিলো আমার সাথে সাথে একটা গাছ হাঁটছে। ভয়ে আমার সারা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছিলো। কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে বুঝতে পারলাম ওটা গাছ ছিল না, ছিল এক গোছা চুল। সারা পথে আর ভয় ধরেনি।

আমার নতুন আশ্রয়ে এসে বন্ধু আব্দুল্লাহর পরামর্শে পাজামা-পাঞ্জাবি ছেড়ে একটু দামী গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট, ভালো শার্ট ও জুতা পড়া শুরু করলাম। এটা আমার জন্য একটা বিশাল পরিবর্তন। বন্ধুরা আমাকে স্বাদরে গ্রহণ করলো। আমার ভেতর আর কোন হীনমন্যতাবোধ ছিল না। এমনকি আব্দুল্লাহ হাসতে হাসতে বলে ফেললো যে উকিল সাহেবের সুন্দরী বড় মেয়েটার নজরও আমার উপর পড়তে পারে। বন্ধুর রসিকতা খারাপ লাগে নাই। আমাকে প্রথমদিন এই পরিবর্তিত পোশাকে দেখে মেয়েটি যে মধুর হাসি উপহার দিয়েছিলো তা বহুদিন স্মৃতিতে ছিল। স্কুলের ফলাফল উত্তরোত্তর ভালো হওয়া এবং পোশাক পরিবর্তন আরো অনেক বন্ধুকে কাছে টানলো। কিন্তু বন্ধু হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে আব্দুল্লাহই ছিল সবথেকে কাছের। আব্দুল্লাহ নিজেও ছিল একটা আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের ছেলে। এরকম অবস্থায় থেকেও যে বিশাল বিশাল স্বপ্ন দেখা যায় তা আব্দুল্লাহর কাছেই শিখেছি। দশম শ্রেণীতে আমি যখন বুয়েটে পড়ার মত লালিত স্বপ্নে বিভোর তখন আব্দুল্লাহর স্বপ্ন কোন আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার।

খুলনা জেলা স্কুলে আমাদের এসএসসির পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল। প্রতিদিন দুই বিষয়ের উপর সকাল-বিকাল পরীক্ষা হত। টিফিনের সময় দেখলাম সবার বাবা-মা ভাই-বোন কেউ না কেউ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আমার জন্য তো কেউ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে না। আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। একটু পর আব্দুল্লাহ এসে ওর অপেক্ষমান বাবার কাছে নিয়ে গেলো। আব্দুল্লাহ বললো তাঁর বাবা আমাদের দুজনের জন্যই খাবার এনেছেন। আব্দুল্লাহই এই ব্যাবস্থাটা করে এসেছিলো। পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর সময়ও একইভাবে খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে।

প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করে খুলনার অদূরে বিএল কলেজে ভর্তি হলাম। খুলনা থেকেই বাসে করে আসা-যাওয়া করতে হবে। আমার বন্ধু ভাগ্য ভালো। আব্দুল্লাহর পর যে আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল সে হচ্ছে মোস্তাক। পূর্বেই বলেছি তাঁর বাবা একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। বেশ কিছুদিন খুলনায় থেকে সেখানেই থাকার জন্য একতালা একটা বিল্ডিং তৈরী করে মোস্তাকরা। বিশাল বড় ছাদের এক পাশে একটা রান্নাঘর ও একটা বড় বেডরুম করেছিল। সেটা এমনভাবে করা হয়েছিল যে পরবর্তীতে দোতালা করলে এই রুমগুলো তার অংশ হয়। হঠাৎ একদিন মোস্তাক এসে প্রস্তাব দিলো আমি যেন ফারাজীপাড়ার এই বাড়িতে থাকি। কোনো ভাড়ার ব্যাপার নাই। তাঁর বাবা চট্টগ্রামের এসডিও হিসেবে সপরিবারে সেখানে চলে যাবেন। তাঁদের এই বাড়ির প্রথম তলায় স্বামী-স্ত্রীর একটা ছোট পরিবারকে ভাড়া দেওয়া হয়। ছাদের উপরের রুম দুটোর সামনে বিশাল রেলিং ঘেরা খোলা ছাদ। আমার পৃথিবীটাই যেন আলোয় ভরে যাচ্ছে। আব্দুল্লাহর সাথে আলাপ করে বন্ধু মোস্তাকের প্রস্তাব গ্রহণ করলাম।

ঠিক এইসময় ছোট কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে একটা হাত ঘড়ি কেনা। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার বাবাকে বলেছিলাম ঘড়ি কিনে দেবার জন্য। খুব বাজেভাবে বলেছিলেন আমি যেন কামাই রোজগার করে ঘড়ি কিনে নেই। আমি তখন একজনের ঘড়ি দেখে ঘরের চালে রোদের ছায়া দেখে স্কুলে যাবার সময়ের দাগ কেটে নিয়েছিলাম। কলেজে ভর্তির পর প্রথম স্কলারশিপের টাকায় একটা সিটিজেন হাত ঘড়ি কিনি। এই বয়সেও নিজের টাকায় হাত ঘড়ি কেনাটা একটা উত্তেজনাকর ব্যাপার। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো যে সব কিছু সহজ হয়ে আসছে।

চলবে…

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট