৩ জুন ২০২০

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-১৩)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ১২ ডিসেম্বর ২০১৭



প্রায় শ’তিনেক শরণার্থীর সাথে স্কুল ঘরে প্রথম রাত কাটালাম। কর্দমাক্ত রাস্তায় সারাদিন হাঁটার ক্লান্তির কারণে শক্ত কাঠের বেঞ্চিতে গভীর ঘুমে রাত কাটলো। এত লোক, বিশেষত মহিলাদের প্রাতঃকৃত্য সারার ব্যাপারটা শরণার্থীদের একটা বড় সমস্যা যা সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেকেই অনুধাবন করতে পারবে না। সদর রাস্তায় যাওয়া যাবে না বলে গ্রামের রাস্তায় দিনের বেলায়ই আমাদের বেশীরভাগ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। শরণার্থীদের সবাই পথের জন্য চিড়া-মুড়ি নিয়ে এসেছে। আমাদের দু’জনের সে ব্যবস্থা ছিল না। তাই দশ টাকা করে থাকা দুজনের সম্বল থেকে যখনই গ্রামের কোন বাজার পেয়েছি সেখান থেকে খাবার কিনে খেয়েছি।

হাজার হাজার শরণার্থীর কাফেলায় সবাই বিষণ্ন চেহারার মানুষ। এত বিপুল সংখ্যক বিষণ্ণ মানুষ একসাথে দেখি নাই জীবনে। এরা সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরীহ গরীব মাটির মানুষ। পাক হানাদার বাহিনীর কাছে এরা মানুষ নয়, এরা হিন্দু। দেশে থেকে যাওয়াটা আমার ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার হুমকিতে ছিল না। কিন্তু আমার সেই বয়সে দেশের জন্য কিছু করণীয় আছে এই ধারণা থেকে ভারতমুখী হয়েছি। আমার চেহারায় হতাশা, অনিশ্চয়তা বা বিষণ্নতা ছিল না এই কারণে যে আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম ভারতে ট্রেনিং নেব, দেশে ফিরব, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করব। কিন্তু শরণার্থী কাফেলার যে বৃদ্ধ লোকটি বা মহিলাটি বংশ পরম্পরায় বসবাস করা ভিটেমাটি ছেড়ে এসেছে সে এই যাত্রাকে একমুখী যাত্রা হিসেবে ভাবছে। আমার এই পরিণত বয়সে একটু একটু করে গড়া বসতবাড়ির ভাবনা দিয়ে তাদেরকে আরও ভালো করে বুঝতে পারি।

যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তা এখন আর নাই। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যখন সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে তাদের রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয় তখন তারা আবারও একমুখী শরণার্থী কাফেলা তৈরী করে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দেখা সেই ছবি আমাকে একাত্তর সালে নিয়ে যায়, একইভাবে পীড়া দেয়।

বাড়ি থেকে রওনা দেওয়ার তৃতীয় দিন শেষে আমরা যশোহর সীমান্তে পৌঁছাই। কিন্তু তার আগেই ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা চাক্ষুস করেছি যা এখনও ভুলতে পারি না। শেষ দিনের শুরুতে আমরা এটুকু আগাম জানতে পেরেছিলাম যে আজ শেষ রাতে বর্ডার পার হতে হবে।

শেষদিন আনুমানিক দুপুর তিনটার দিকে দেখলাম ২০/২১ বছর বয়সের একটা ছেলে এক বৃদ্ধকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছে; অনেকটা বিচ্ছিন্ন। আমরা দূর থেকে দেখলাম কি কষ্ট করে বৃদ্ধ লোকটিকে একা ঘাড় থেকে নামাচ্ছে একটুখানি বিশ্রাম নেবার জন্য। কাছে গিয়ে জানতে পারলাম অশীতিপর মরণাপন্ন বৃদ্ধ লোকটি তাঁর বাবা। লোকটির চেহারাটা অনেকটাই জ্যান্ত কংকাল। সে আরো বললো যে গত দুইদিন ধরে এভাবে তাঁর বাবাকে বয়ে নিয়ে এসেছে। ছেলের কষ্ট দেখে বাবা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন রাস্তার পাশে রেখে একা চলে যেতে। ছেলেটা হাউ-মাউ করে কেঁদে বললো, ‘কিভাবে রেখে যাবো বাবাকে!’ তাঁর বাবাকে ঘাড় থেকে নামানোর থেকে একা ঘাড়ে তোলাই ছিল বেশি কষ্টের। আমরা তাঁকে আশ্বাস দিলাম সাথে থাকার। আমরা দুইজন ওদের পিছনে পিছনে হাঁটছি। যখনই ঘাড় থেকে নামানোর দরকার হত আমরা গিয়ে সাহায্য করেছি।

এভাবে ঘন্টা দু’য়েক চলার পর হঠাৎ করে ছেলেটি কেঁদে উঠলো, ‘আমার বাবা বোধহয় নাই।’ কয়েকবার তাঁর ডাকে সাড়া না দেওয়াতে সে বুঝতে পেরেছিলো যে তার বাবা চলে গিয়েছেন পরপারে। আমরা দু’জন গিয়ে ধরে নামালাম। বাবা হারানোর চিরায়ত কষ্ট ও ঘাড়ের বোঝা নেমে যাবার স্বস্তি একসাথে তাঁর মুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি এনে দিয়েছিলো যা আমি এখনও ভুলতে পারি না। এবার আমরা তিনজন মিলে তাঁর বাবার দেহ ধরে রাস্তা থেকে একটু দূরে খালের পাড়ে রেখে আসলাম। খালের পাড়ে রেখে আসার সময় ছেলে হিসেবে তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল মুখাগ্নি করার। কিন্তু আমাদের করো কাছে লাইটার বা ম্যাচকাঠি না থাকায় তা করা গেল না। সন্ধ্যায় পৌঁছুলাম তিনজন সেই স্কুলে যেখানে রাত কাটিয়ে ভোররাতে বর্ডার পার হবার কথা। বৃদ্ধ লোকটির সাথে ঘন্টা দু’য়েক ছিলাম। মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। এককোটি শরণার্থীর কাফেলায় হয়তো এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।

ভোররাতে আকাশ পরিষ্কার হবার আগেই একজন আশেপাশে দেখে এসে জানালো যে কোন আর্মি টহল নাই। বর্ডারে ছোট একটা নদী যা নৌকা দিয়েই পার হতে হবে। আমরা পাড়ে যেতেই উল্টো দিক থেকে বেশ কয়েকটা নৌকা আমাদের পাড়ে এসে ভেড়ে। খুব দ্রুততার সাথে আমরা পার হলাম। এই পারাপারের ব্যাপারটা ছিল ভলান্টিয়ারি, কোন পয়সা লাগে নাই।

চলবে...

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট