১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৩৮)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ৩ অক্টোবর ২০১৮



আবার সেই আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়লাম। বাড়ি থেকে যা টাকা আসতো তা অবধারিত নয়। প্রতিমাসে ফিরিস্তিসহ পুরো টাকার আবেদন করতে হবে। যদিও জানতাম আমার পাঠানো হিসেবের কমবেশী অর্ধেক টাকা আসবে বাড়ি থেকে তবুও আমি শতভাগ সততার সাথে হিসাবটা করতাম। এর ভেতর একটা ভালো খবর পেলাম। প্রাথমিক দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে মাসিক ৬০ টাকা শিক্ষাবৃত্তি পেতে শুরু করলাম। অনটনটা থেকে গেলেও এটা অনেকটা স্বস্তিদায়ক। তখনকার ৬০ টাকা বেশ বড় অংক।

টিউশনি খোঁজা অব্যাহত রাখলাম। বছরের মাঝামাঝি সময়ে বুয়েটের একজন সিনিয়র প্রকৌশলীর পুত্রকে পড়ানোর কাজ পেলাম সেগুনবাগিচায়। হল থেকে বাইসাইকেলে করে পড়াতে যেতাম। বুয়েটের ছাত্র হিসেবে সমাদর ছিল এ বাড়িতে। এভাবে প্রথমবর্ষের পড়া শেষ করি। আমাদের সময়ে বাৎসরিক পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল। একটা অর্ধবাৎসরিক পরীক্ষা ছিল যা ঐচ্ছিক। অর্ধবাৎসরিক পরীক্ষা না দিয়ে বছর শেষে একবার পরীক্ষা দিয়েই পাশ করা যেত। আমি বছর শেষে একবার পরীক্ষা দিয়েই পাস করেছি।

আমাদের সময় প্রথমবর্ষের শিক্ষা কার্যক্রম সবার জন্য এক ছিল। কে কোন বিভাগে পড়বে তা বেছে নেবার সুযোগ ছিল দ্বিতীয় বর্ষ থেকে। এই সময়ে বন্ধুদের দোদুল্যমনা অবস্থা দেখে মজা পেতাম। আমার আশৈশব স্বপ্ন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। তাই দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার বিষয় নিয়ে আমার সিদ্ধান্তহীনতার অবকাশ নাই। বন্ধুদের কাউকে হয়তো দেখলাম মেকানিক্যালে দুই সপ্তাহ ক্লাস করে ভালো লাগলো না, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ক্লাস শুরু করলো। সেখানে হয়তো ভালো লাগলো না, ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ক্লাস করা শুরু করলো। প্রথম দুই মাসে এমন পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ ছিল।

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটা অতি প্রয়োজনীয় পাঠ্য বিষয় ছিল ড্রয়িং। ড্রয়িং ক্লাসের দিন প্রত্যেককে ড্রয়িং বোর্ড, ট্রাইস্কয়ার, ড্রইংয়ের কাগজ নিয়ে দৌঁড়াতে হত ক্লাসের দিকে। ড্রয়িং ক্লাস নিতেন জাকি আহমেদ নামে একজন শিক্ষক। প্রথম দিন বিস্মিত হলাম তাঁর খালি হাতের ড্রয়িং দেখে। একটানে ব্ল্যাকবোর্ডে হাতে আঁকা একটা বৃত্ত যে এতো নিখুঁত হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। ধীরে ধীরে ড্রয়িং ভালোবাসতে শুরু করলাম। যেকোনো একটা বস্তু সামনে, পিছনে, ডাইনে, বায়ে ও উপর থেকে দেখতে কেমন হবে তা নির্দিষ্ট ছকে আঁকতে হবে। এই বস্তুটি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কল্পনায় কেটে ফেললে কেমন হবে তাও আকঁতে হবে। দীর্ঘ কর্মজীবনে ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে দেখলাম ড্রয়িং জ্ঞান ছাড়া একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সম্পূর্ণ অচল।

আমার অনেক প্রতিকূল অবস্থায় সাহস যোগানো বন্ধু আবদুল্লাহর কথা আগেই বলেছি যে সে ইচ্ছাকৃতভাবে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার খাতায় কিছু না লিখেই অকৃতকার্য হয়েছে। তার একটাই ধ্যানজ্ঞান, আমেরিকাতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। কিন্তু তার পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এমনকি বুয়েটে পড়ার মত আর্থিক সঙ্গতিও নাই। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসার আগে একদিন আবদুল্লাহর বিছানায় দুপুরে খাবার পরে শুয়ে গল্প করছি। এমন সময়ে ভাড়া বাড়ির গোল পাতার ছাউনিতে একটা ছিদ্র দেখিয়ে আমাকে দৃঢ়তার সাথে বললো, ‘ঘরের চালার ছিদ্র দেখতে দেখতেই তোমাকে বলছি আমি আমেরিকাতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো’। আমি নিজে অনেক সাহসী হলেও আব্দুল্লাহর এই দৃঢ়তার ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। আমি বুয়েটে পড়াশুনা শুরু করায় আব্দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ কমে গেলো। সে তখন খুলনায়।

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে সে ঢাকায় এসে আমাকে জানালো যে সে আমেরিকার ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের নর্থ ওয়েস্টার্ন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। টোফেল স্কোর পাঠালে আই ২০ আসবে। সে জন্যই সে ঢাকায় এসেছে। এতখানি অগ্রগতি দেখে তাকে টাকার খবর জানতে চাইলাম। সে খুলনার হারুনুর রশীদ নামের একটা পরিচিত ছেলের কথা বললো যাকে আব্দুল্লাহ ঠিক বন্ধু বলে স্বীকার করে না। স্বাধীনতার পর অনেক সুযোগ সন্ধানীদের একজন ছিল হারুনুর রশীদ। বৈষয়িক বুদ্ধিতে আমাদের থেকে অনেক অগ্রগামী। রেশনের ডিলারশিপ নিয়ে সে ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ। সাথে পড়াশুনাটাও চালিয়েছে। আব্দুল্লাহ তার কাছে জানতে চাইলো সে এতো টাকার মালিক হলেও আমেরিকায় পড়াশুনা করার সুযোগ তার আছে কিনা, না-সূচক উত্তর পেয়ে আব্দুল্লাহ তাকে প্রস্তাব দিলো দুইজনের একবছর পড়ার খরচের বিনিময়ে আব্দুল্লাহ তাকে ভর্তির ব্যাপারে গাইড করবে ও স্পন্সর জোগাড় করে দেবে। হারুনুর রশীদ তাতে রাজী। দুইজন একসাথে ভর্তি হলো। আমেরিকা প্রবাসী চট্টগ্রামের একজন ধনাঢ্য ডাক্তার দুইজনকেই স্পন্সর করলো কাগজে-কলমে। সারা বছরের টাকার ব্যবস্থা করলো হারুনুর রশীদ। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আমেরিকাতে তাদের ক্লাস শুরু হবে। আগাস্টের মাঝামাঝি আমেরিকার উদ্দ্যেশে রওনা দেওয়ার সময় আব্দুল্লাহ নিশ্চিত করে বলে গেলো যে আমাকেও তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবে আমেরিকাতে। আমার দ্বিতীয় বর্ষ শেষ করতে তখনও মাস চারেক বাকী।

(চলবে...)

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট