২৫ মে ২০১৯

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৩৯)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ১০ অক্টোবর ২০১৮



আব্দুল্লাহ আমেরিকা চলে যাবার পরও সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত পড়াশুনা চালিয়ে গেলাম। জীবনে বহু অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগুপিছু বিস্তারিত চিন্তা করলে সে সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারতাম না। কিন্তু এখনকার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা পরবর্তীতে পরিণত বয়সেও বের করতে পারি নাই। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বুয়েটের পড়াশুনা বাদ দিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে বাড়িতে চলে গেলাম। সিদ্ধান্তটা অনেকটা চার বছরের শিশুর গভীর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নিকটজনের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে লাফিয়ে পড়ার মত। আমেরিকা রওনা দেওয়ার সময় আব্দুল্লাহ আমাকে কথা দিয়ে যায় যে অতি শীঘ্রই সে আমাকে সেখানে নেবার ব্যবস্থা করবে। আব্দুল্লাহ আমার এমন একজন বন্ধু যে তার কথার উপর আমি শতভাগ ভরসা রাখতে পারি। আমি একবারও এটা বিশ্লেষণ করে দেখতে যাই নাই যে কিভাবে আব্দুল্লাহ আমাকে নেবে। তার নিজেরই টাকা পয়সার খবর নাই। তাছাড়া একনাগাড়ে এত বছর সংগ্রাম করে কিছুটা হয়তো হাঁফিয়েও উঠেছিলাম। বাড়িতে ফিরে বাবা মাকে আমেরিকা যাবার কথা বলে সামাল দিলাম। আমার বাবা একবারও প্রশ্ন করেন নাই টাকা পয়সা কোথা থেকে আসবে। অতীতে এমন সব অসাধ্য সাধন করেছি যে বাবার হয়তো বিশ্বাস ছিল এবারও আমি সামাল দিতে পারবো।

বাড়িতে সপ্তাহ খানেক থেকে খুলনায় গেলাম একটা থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে। খুলনার ধর্মসভা ক্রসরোডে থাকার একটা জায়গা পেয়ে গেলাম বিনা ভাড়ায়। আমার পূর্ব পরিচিত এক লোকের দুই রুমের এপার্টমেন্টের একরুম আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। বিশাল বড় সেই রুমের ভেতরই রান্নার ব্যবস্থা। খুলনায় থাকার সুবিধা হলো বাড়ি থেকে চাল-ডালের যোগান আসা। বাড়িতে ফেরত গিয়ে সেসব নিয়ে খুলনার আস্তানায় সংসার পাতলাম। এখানে থাকার জন্য টাকা-পয়সার প্রয়োজনটা ঢাকার মত নয়। তাই বাবা তেমন কিছু না বলেই যখন যা চেয়েছি তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। ক’দিন পর আমেরিকা যাচ্ছি এটাও হয়তো বাবার সহনশীলতার কারণ।

একটা কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে আমার থাকার জায়গাটা সেই শ্রদ্ধেয় উকিল আবুল কাশেম সাহেবের বাড়ির উল্টো দিকে যার প্রথম কন্যাকে স্মরণ করেছিলাম পাক মিলিটারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কচুরিপানার ভেতর শুধু নাক পানির উপর রেখে লুকিয়ে থাকার সময়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে খুলনায় থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, পরে বুয়েটে ১৯৭৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশুনা করেছি। এই দীর্ঘ সময় পর্যন্তও সেই মেয়েটার খোঁজ নেবার কোনো কৌতূহল আমার ভেতর জাগে নাই। হয়তো যুদ্ধ ও যুদ্ধত্তোরকালে নানান টানা পোড়েনে এই প্রসঙ্গ আসে নাই মাথায়।

খুলনায় সংসার পাতার সপ্তাহ খানেকের ভেতর রেহমুকে দেখার কৌতূহলের কাছে হার মানলাম। সেই চেনা দরজায় টোকা দিয়ে অপেক্ষায় আছি। তারা এখানে আদৌ থাকে কিনা তাও জানি না। আবার ভাবছি সেই সাইকেল রাখতে আসলে দরজা খোলার পর দেখা ভুবন ভুলানো হাসি যদি আবার দেখতে পাই! তার কিছুই হলো না। তার ছোট বোন দরজা খুলে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। আমার মাথা ভর্তি ঘাড়ে নামা ঝাঁকড়া চুল, যে চেহারার সাথে এরা পরিচিত না। পরে বুঝতে পেরে চিৎকার করে সবাইকে আমার আগমনের কথা জানান দিলো। সেই অদ্ভুত মুখটেপা হাসি নিয়ে রেহমু সামনে এসে দাঁড়ালো। চা নাস্তা খেয়ে ওই দিনের মত বিদায় নিলাম। এটা বলতে ভুললাম না যে তাদের বাড়ির উল্টো দিকেই আমার বর্তমান ঠিকানা। এখানে আবার ফেরত আসার কথা দিয়ে নিজ আস্তানায় ফিরলাম।

(চলবে...)

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট