২২ জুলাই ২০১৯

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৪০)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১৮



এত বছর পর রেহমুর সাথে দেখা হলো। প্রথম দেখার পর সামনাসামনি বাড়িতে থেকেও এক সপ্তাহ পর আবার গেলাম। শুনলাম সে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারে নাই। আমার উপর দায়িত্ব চাপলো তাকে সাথে করে নিয়ে খুলনার আশেপাশের কোন স্কুল থেকে ফর্ম পূরণ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায় কিনা। মাস দুয়েক সময়ের ভেতর বেশ কয়েকবার হুড তোলা রিকশায় করে বিভিন্ন স্কুলে গিয়েছি। পানসী নৌকায় তাকে নিয়ে নদী পার হয়ে অন্য পাড়ের স্কুলেও গিয়েছি। নদী পারাপারের সময় ঢেউয়ে রেহমুর ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও ছিল আমার উপর। মাস দুয়েক ঘোরাঘুরি করে কাজের-কাজ কিছুই হলো না। উদ্দেশ্যবিহীন জীবনে সময়ের তখন অভাব ছিল না। কিন্তু সচেতনভাবে সরে এসেছি। এই পুরোটা সময়ে কেউ কারো মনের অবস্থা প্রকাশ করি নাই। অথচ কচুরিপানার ভেতর নাক তুলে পাকিস্তানি মিলিটারির হাত থেকে বাঁচার চেষ্টারত অবস্থায় একমাত্র এই মেয়েটির কথাই মনে পড়েছিলো। তার সাথে আর দেখা হবে না এই বোধটাই কাজ করছিলো। ১৯৭৪ সাল পার করে ১৯৭৫-এ পড়লাম। এত কাছে থেকেও দেখা সাক্ষাৎ ছিল না। ৭৫ সালের মার্চের দিকে আমি ধর্মসভা ক্রসরোডের যে বাড়িতে থাকি তার উপরতলা থেকে আমাকে ডেকে পাঠানো হলো। সেখানে থাকতো রেহমুর ফুফাতো বোন, স্বামী সন্তানসহ। এই মহিলার ছোট ভাইয়ের সাথে রেহমুর বিয়ের কথা চলছে। মহিলা কয়েকবার রিকশায় করে রেহমুকে নিয়ে যেতে দেখেছেন। কোন রকম ভনিতা না করে আমার সাথে রেহমুর সম্পর্কের গভীরতা কতটুকু তা জানতে চাইলেন। কোনভাবেই তাকে বুঝাতে পারছিলাম না যে এটা একেবারেই একটা প্লেটোনিক সম্পর্ক। লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে শেষমেষ জানতে চাইলেন এর ভেতর কোন শারীরিক সম্পর্ক ছিল কিনা। আমি তাকে পরিশেষে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে এটা রিকশায় গায়ে গা লাগিয়ে বসার ভেতরই সীমিত ছিল।

জীবনে এই প্রথম উদ্দেশ্যবিহীন সময় কাটানো। জীবন সংগ্রামে কখনও আমি হতাশাগ্রস্থ হই নাই। আমার নজর ছিল কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে। বাধাগুলো চোখে পড়ে নাই। আব্দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ নাই। হতাশার এটাও একটা কারণ। বুয়েট ছেড়ে আসাটা একেবারেই আমার সিদ্ধান্ত। আব্দুল্লাহ জানেই না যে আমি পড়াশুনা ছেড়ে বসে আছি। আব্দুল্লাহর বাবা কাশেম সাহেবের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন যে আমি খুলনায় থাকি। এই রাশভারী লোকটাকে অনেকটা ভয়ই পেতাম। তাই পড়াশুনা বাদ দিয়ে বসে থাকা অবস্থায় তাঁর সামনে যেতে সাহস হয়নি কখনো। আমার তখনও বিশ্বাস আমাকে আমেরিকা নেওয়ার ব্যাপারে আব্দুল্লাহ কিছু একটা করবে।

জুলাই মাসের প্রথম দিকে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। দুই সেমিস্টার শেষ করে পাততাড়ি গুটিয়ে হারুনুর রশীদ ও আব্দুল্লাহ দেশে ফেরত আসলো। আব্দুল্লাহর বাবা ভীষণ রেগে গেলেন। কোনভাবেই তাঁকে বুঝানো গেলো না যে ওকলাহোমার মত জায়গায় পার্ট টাইম কাজ করে পড়ার খরচ জোগাড় করা যায় না। তিনি আব্দুল্লাহর সাথে রীতিমত কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। আব্দুল্লাহ ছিল ভাইদের ভেতর বড়। আব্দুল্লাহকে কিছু না জানিয়ে চাচাজী অন্য এক ছেলেকে আমার কাছে পাঠালেন। তিনি খবর দিলেন আব্দুল্লাহকে বাড়ি ছাড়তে হবে। আরো বলেছেন আমি যেন মালামালসহ আব্দুল্লাহকে আমার জায়গায় নিয়ে আসি। আমি আব্দুল্লাহর ওখানে গিয়ে চাচাজীর সিদ্ধান্তের কথা তাকে জানালাম। এরপর দুই বন্ধু বেশ কিছুটা সময় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। এমন খারাপ সময়েও বন্ধুকে পেয়ে আবার সাহস ফিরে পেলাম। আমেরিকা থেকে ভাই বোনদের জন্য আনা কোন উপহার সামগ্রীও চাচাজী বাসায় রাখতে দিলেন না। আব্দুল্লাহর কোনো সুটকেসও তখন খোলা হয়নি। আমরা দুইজন দুই রিকশায় সব মালামাল নিয়ে আমার আস্তানায় হাজির হলাম।

দুজনার জন্য আমার বিছানাটা একটু ছোট। বালিশ দুটো ছিল। সমস্যা অন্য জায়গায়। দুইজন একই সময়ে চিৎ হয়ে শুলে জায়গায় সংকুলান হয় না। একজন কাত হয়ে অন্য জন চিৎ হয়ে শুতে হবে। আব্দুল্লাহ আমার এমন ভালো বন্ধু ছিল যে এভাবেও সাচ্ছন্দে এক বিছানায় অনেক দিন পার করেছি।

মাস খানেক পর আব্দুল্লাহর বাবা আবার খবর পাঠালেন। এবার সরাসরি আব্দুল্লাহকে নির্দেশ দিলেন বাড়ি ফেরত যেতে। এখানে মান অভিমানের সুযোগ নাই। এ আদেশ অবশ্য পালনীয়। আবার দুই বন্ধু দুই রিকশায় মালামালসহ।

(চলবে...)

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট