২৫ মার্চ ২০১৯

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৪১)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০১৮



আব্দুল্লাহকে পৌঁছে দিয়ে আসলাম তাঁর বাসায়। কিন্তু শুধু রাতে থাকার জায়গা বদল হল। সারাদিন দুই বন্ধুর ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা। এমন খারাপ সময়েও আমরা মানসিক শক্তি ফিরে পেলাম। পরিকল্পনা করতে থাকলাম কিভাবে এবার দুজনের একসাথে আমেরিকা যাওয়া যায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সকালবেলা আব্দুল্লাহ আমার বাসায় এসে দরোজায় ধুমধাম ধাক্কা দিতে থাকলো। দরজা ধাক্কানোর শব্দে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে আব্দুল্লাহকে দেখে শংকিত হলাম। আব্দুল্লাহ বললো বঙ্গবন্ধুকে মিলিটারীরা মেরে ফেলেছে। আব্দুল্লাহর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। আব্দুল্লাহর বড় দুলাভাই তখন টিএন্ডটি-এর ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, খুলনাতে পোস্টিং। তিনি ঢাকা থেকে তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে খবরটা পেয়েছেন। সেখান থেকে আব্দুল্লাহ জেনেছে। আমার বিছানার উপর দুই বন্ধু বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলাম। সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা কানে বাজছিলো। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারটা এই কয় বছরে ভুলেই গিয়েছিলাম। সবসময় মনে করতাম দেশের প্রয়োজনে যে ভূমিকা রাখার দরকার ছিল তা রেখেছি। এখন মনে হলো এই লোকটার আহবানে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলাম, দেশ স্বাধীন করেছি। পাকিস্তানিরা যাঁকে মারতে পারে নাই, আমরা তাঁকে মেরে ফেললাম!

আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধুর খুনীরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসলো। বঙ্গবন্ধুর এমন কাছের লোক মোশতাককে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিলো না। ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সকলে দিনের আলোয় আত্মপ্রকাশ করলো। নাটের গুরু খুনি জিয়ার তখন আসল চেহারায় বেরিয়ে আসলো। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে আমৃত্যু আইএসআইয়ের স্থানীয় এজেন্ট খুনী জিয়া মুক্তিযোদ্ধা নিধন চালিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সেনা নিধনের এই দিকটা এখনও উপেক্ষিত। এসকল শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও কখনো জনসমক্ষে আসে নাই। চার হাজারের বেশী মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্য আমাদের ইতিহাস থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর সপ্তাহখানেক অনেকটা ঘোরের ভেতর কাটলো। সকালে আব্দুল্লাহ এসে, আমাকে নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে যেত। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর বড় দুলাভাইয়ের বাসায় যেতাম। নিচের তলায় টিএন্ডটির ডিভিশনাল ইন্জিনিয়ারের অফিস। উপরতলায় বাসা। প্রতিদিন সেখানে গিয়ে নাস্তা খেতাম এবং ঢাকার অবস্থা জানার জন্য পরিচিতদের ফোন করে খবর নিতাম। আমি বুয়েটের পড়াশুনা ছেড়েছি, আব্দুল্লাহ আমেরিকার পড়া ছেড়েছে। দুজন কেবল আবার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম যে এবার আমরা এক সাথেই আমেরিকা যাব। কিভাবে যাবো তা জানতাম না। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতি বদলে দিল। দেশের অবস্থা কোথায় যাচ্ছে নিশ্চিত নই। এই অনিশ্চয়তা আমাদের দুজনের ভেতর হতাশার জন্ম দিলো। এই উদ্দেশ্যবিহীন ঘোরাঘুরিতে দুজনেরই উৎসাহ কমে গেলো। আস্তে আস্তে দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ কমে আসলো। বাড়িতে বাবা কিছুটা দুশ্চিন্তা করা শুরু করলেন। বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, চাল-ডালের যে যোগান আসছিলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা শুরু হলো। কতদিন এভাবে চলবে। কখন আমেরিকা যাবো, কিভাবে যাবো, এমন সব প্রশ্ন।

বাড়ির উপর নির্ভরশীলতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এর সপ্তাহখানেক পর বন্ধু মকবুল হোসেন মিন্টুর সাথে দেখা। সে আমার অবস্থা শুনে তাদের বাসায় নিয়ে গেলো। তার বড় ভাই ডাক্তার। তার ভাবীর সাথে আলাপ করে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া তার ভাতিজিকে পোড়ানোর অনুরোধ করলো। সাথে এটাও বললো যে এপর্যন্ত অনেক শিক্ষক চেষ্টা করে তাকে পড়াতে পারে নাই। সে স্কুলের ও গৃহশিক্ষকের কোনো হোমওয়ার্ক করতো না। ক্লাসে পরীক্ষায় ফলাফলের দিক থেকে একেবারে নিচের দিকে। মকবুলের ধারণা আমার কাছে হয়তো পড়বে, কারণ আমি তার বন্ধু। আমাকে হয়তো সে গতানুগতিক শিক্ষক হিসেবে দেখবে না। ব্যাপারটা তাই হলো। আমার সব কথা শুনতো, সব হোমওয়ার্ক করতো। দিন দশেক পর একবার সে আমার কাছে পড়তে আসতে চাচ্ছিলো না। কারণ তার হোমওয়ার্ক তৈরী হয়নি। যাই হোক বুঝিয়ে শুনিয়ে তার মা আমার কাছে দিয়ে গেলো। মাস খানেক পড়ার পর মেয়েটার ভেতর আমূল পরিবর্তন আসলো। এর ভেতর একটা পরীক্ষায় নম্বরের দিক থেকে প্রথম তিনজনের ভেতর চলে এসেছে। বাড়ির সবাই অবাক। আমি ওকে কখনোই বকাঝকা করি নাই। স্বভাবগতভাবে আমি একটু গম্ভীর। সেটাই হয়তো কাজে দিয়েছে। বন্ধুর ভাতিজিকে পড়ানোর জন্য টাকার কথাতো বলতে পারি না। মাস শেষে যা পেলাম তা আমার ধারণার প্রায় দ্বিগুন।

(চলবে...)

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট