২৫ মার্চ ২০১৯

...
...


জীবনের রণাঙ্গন থেকে... (ধারাবাহিক আত্মজীবনী পর্ব-৪২)

লেখক: ফকির এখলাসুর রহমান

তারিখ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮



খুলনার খালিশপুরে তুহিন রহমান নামে আমার একজন ভালো বন্ধু ছিল। আমাদের ব্যাচমেট। কোনো মেয়ের সাথে এমন নির্মল বন্ধুত্বের সম্পর্ক এই প্রথম। বুয়েটে পড়াকালীন সময় তুহিনের সাথেই আমার নিয়মিত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান ছিল। একবার ছুটিতে খুলনায় বেড়াতে আসলাম। তুহিনদের বাসায় আড্ডা সেরে রাত এগারোটার দিকে যখন বের হলাম তখন দেখলাম আমাদের পিছে পিছে তুহিনের ছোট বোন শিরীনও বের হলো। বারান্দার আলোয় দেখলাম মিটি মিটি হাসছে। পিছন ফিরে জানতে চাইলাম সে আমাকে কিছু বলবে কিনা। অবাক হয়ে দেখলাম সে আমার দিকে চিঠি লেখার একটা প্যাড বাড়িয়ে ধরেছে। অল্পবয়সী ছেলে মেয়েরা প্রেমপর্বে এধরণের ডিজাইন করা প্যাড ব্যবহার করে। আমি শিরীনের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি কোন প্রশ্ন করার আগেই সে যা বললো তাতে খুবই লজ্জা পেলাম। সে বললো ‘সেজো আপাকে যে কাগজে চিঠি লেখেন তা দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে। কালকে আপনি ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। এটা সাথে নিয়ে যান। এরপর থেকে এই প্যাড ব্যবহার করবেন’। তুহিনকে হাতের কাছে যা পেতাম তার উপরে খুব সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখতাম। দেখা গেলো একটা কাগজের অর্ধেকের বেশী লেখা আছে। লেখাটা দরকার। লেখাটা রেখে বাকীটা হাতে টান দিয়ে ছিড়ে তাতে চিঠি লিখে পাঠালাম। কাগজটা ছেঁড়াও হয়তো এক লাইনে হলো না। একবার বাজারের ঠোঙ্গার একটা অংশ ছিড়ে তাতে চিঠি লিখেছি। দ্রুত সব কৃতকর্মের কথা মনে পড়লো। এটাও পরিষ্কারভাবে জানতাম যে তুহিনকে অবজ্ঞা করে এমন কাগজে লেখা নয়। তুহিন এটা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। কাগজ ব্যবহারের এই বদভ্যাশটা বিয়ের পরও ছাড়তে পারি নাই। বান্ধবী তুহিন রহমানকে যেভাবে সামাল দেয়া গেছে বৌয়ের বেলায় তো সেটা চলে না !

বুয়েটের লেখাপড়া ছেড়ে খুলনায় বসবাসের উদ্দেশ্যবিহীন হতাশ সময়ে তুহিনদের বাসার আড্ডাটাই আমার একমাত্র আনন্দের বিষয় ছিল। কথা প্রসঙ্গে টুটপাড়ায় বন্ধু মকবুলের ভাজতিকে পড়ানোর কথা বললাম তুহিনকে। তুহিন আমাকে জানালো যে টুটপাড়ায় গোপালগঞ্জের টি রহমান নামের এক ভদ্রলোকও থাকেন, মকবুলদের বাসার কাছে। তুহিন আরও বললো যে সে একদিন আমাকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেবে। তুহিন আমাকে ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে টি রহমান সাহেবের বাসায় নিয়ে গেল। ওখানে গিয়ে এটা বের হলো যে টি রহমান সাহেব আমার এক চাচার স্কুলের সহপাঠী। কিছুক্ষণ বসতেই কুচি দিয়ে শাড়ি পড়া একটা মেয়ে চায়ের কাপ হাতে করে রুমে ঢুকলো। শুকনা পাতলা ভীষণ ধারালো চেহারার মেয়ে। মাথার পিছনে এক পাশে কাত করে বাঁধা চুলের খোঁপা। একপাশে এমন করে চুলের খোঁপা বাধা আগে দেখেছি বলে মনে হলো না। এমন চোখটানা সুশ্রী চেহারা যে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না। আবার অন্যদের সামনে এভাবে তাকানোটাও দৃষ্টিকটু। এরপর থেকে চাচার বন্ধুর বাড়িতে যাওয়াটা নিয়মিত হতে থাকলো। প্রথম মাসে অনেক ব্যাবধানে যেতাম। আস্তে আস্তে যাতায়াতটা বাড়তে থাকলো।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে মনে হলো সারা জীবনের জন্য এমন কাউকেই সাথী করা দরকার। শিরীন তখন খুলনার বয়রা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের দ্বিতীয়বর্ষ বিজ্ঞানের ছাত্রী। একদিন হাঁটুর কাঁপুনি থামিয়ে বাইরে দেখা করার প্রস্তাব দিলাম। কথামত শিরীনের কলেজ গেটে রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করার মিনিট দশেকের ভিতর তুহিনের বাবা আমাকে দেখে রিকশা থামালেন। আমি ওখানে কেন এই প্রশ্নটা করে তুহিনের বাবা আমাকে ভীষণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেললেন। এমন উত্তর দিতে হবে যাতে তিনি কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে না পান। আমার ভয় তিনি মেয়ে তুহিনকে বলে দেবেন কিনা আমার শিরিনের কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকার কথা। এক আত্মীয়ের কথা বলে চালিয়ে দিলাম যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থেকে। তাছাড়া আমাকে তিনি এতটাই ভালো ছেলে বলে জানতেন যে অন্যকিছু বোধহয় তাঁর মাথায় আসে নাই। শিরীনকে নিয়ে এক রেস্টুরেন্টে খেয়ে দুপুরে সিনেমা দেখলাম। সিনেমা হলে অন্ধকারে পাশাপাশি বসে কখন হাতেহাত মিলেছে জানি না। বুয়েটে দ্বিতীয়বর্ষ মেকানিক্যাল শেষ না করে উদ্দেশ্যবিহীন সময় কাটাচ্ছি।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আব্দুল্লাহর আমেরিকাতে যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে গেলো। সেও হতাশায় ভুগতে থাকলো। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ কদাচিৎ হত। এমন একটা অবস্থায়ও শিরীনকে সারা জীবনের জন্য পাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি। এর পূর্বে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। কিন্তু এবার কোনভাবেই হিসাব মিলাতে পারছিলাম না। এত অল্প সময়ে শিরীনকে আমি পুরোপুরি চিনি না। ১৯৭৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। শিরীন আমাকে পরের দিন সুই-সুতো কিনে নিয়ে যেতে বললো। কারণ জানতে চাইলে সে নির্বিকারভাবে বললো যে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের আগে মেয়েদের নাক ফুটা করতে হয়। হঠাৎ করে পায়ের তলা থেকে সব মাটি সরে যাওয়ার এমন মুহূর্ত আমার জীবনে আর আসে নাই। পরের দিন সুই-সুতো নিয়ে যাবার মত মহত্ব দেখাতে পারলাম না। প্রতিদিন দাড়ি কাটার বহুদিনের অভ্যাস ত্যাগ করলাম। তিন দিনে এই প্রথম মুখমণ্ডলে দাড়ি দৃশ্যমান হলো। তিন দিন এক নাগাড়ে তিন ঘন্টাও ঘুমাতে পারি নাই। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক নাই। আমার পারিবারিক অবস্থান এমন যে আমি পিএইচডি করা থাকলেও টি রহমান সাহেব তাঁর মেয়ে আমার হাতে তুলে দেবেন না। সেখানে আমি ডিগ্রির দিক থেকে আইএসসি পাস। এ অবস্থায় শিরীনের আশা পরিত্যাগ করে তিন দিনের মাথায় শেষ দেখা করতে গেলাম। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। তিনদিন পর আমাকে এই অবস্থায় দেখে শিরীন অনেকটা ভড়কে যায়। তাড়াতাড়ি শিরীন ব্যাপারটা খুলে বলে। আমি যেভাবে শিরীনকে চাইছি সেভাবে শিরীনও আমাকে চাইছে। কিন্তু সে আমাকে এত অল্প সময়ে বুঝতে পারছিলো না। সুই-সুতোর ফরমায়েশটা আমাকে চেনার এক নির্মম পদ্ধতি ছিল। বিয়ের ব্যাপারটা বানোয়াট। আমার অবস্থানটা তখন শিরীনের কাছে পরিষ্কার। সে তার দাদীকে বলে রাখলো যে বাবা যেন কোনো বিয়ের প্রস্তাব না আনে। সে আমাকে বিয়ে করবে। মার্চের শেষের দিকে শিরীনের বাবা সব জেনে যান। তিনি কোনভাবেই এটা মানতে রাজী নয়। আমি এতো কিছু তখনও জানি না। তাই আমার যাতায়াতটা আগের মত নিয়মিত আছে। কিন্তু শিরীনের বাবা চাচ্ছিলেন না যে আমি ওখানে যাই।

এপ্রিল মাসের তিন তারিখে আমার সামনে থেকে শিরীনকে ভিতরে ডেকে নিয়ে যায় তার বাবা। উচ্চস্বরে বকাঝকা চললো যা আমিও শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার লেখাপড়া, পারিবারিক অবস্থা সব কিছু বলার পরও শিরীন খুব দৃঢ়তার সাথে তার বাবাকে জানিয়ে দিলো যে সে আমাকেই বিয়ে করবে। মেয়েকে কোনভাবেই বুঝাতে না পেরে এবার শিরীনের বাবা আমার কাছে আসলেন। তিনি আমার উপর সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। আমার সামনে এসে রাগতঃস্বরে পরিষ্কার করে বললেন, ‘আমার মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক। তুমি যদি শিরীনকে বিয়ে করতে চাও তাহলে NOW or NEVER।’ আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত পর্যালোচনা করে তিন সেকেন্ডের ভিতর দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিয়েছি ‘NOW’। ৪২ বছর আগে দেখা আমার শশুরের সেই অসহায় চেহারা এখনো ভুলতে পারি না। তিনি আমার মুখের দিকে বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুধু বললেন ‘আমি তোমাকে কথা দিয়েছি, সেটা আমি রাখবো’। আত্মীয়স্বজন ডেকে সে রাতেই আমাদের বিয়ে হয়। ১৭ বছর বয়সের শিরীনের আবেগতাড়িত অবাস্তব সিদ্ধান্তই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে।

(চলবে...)

আলোকচিত্র

ফকির এখলাসুর রহমান

...
...
...
...


প্রধান সমন্বয়কারী ও সম্পাদক: রুদ্র সাইফুল
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১১০৩১১৫৯

ওয়েবসাইট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধায়নে

এহসান আলী, কম্পিউটার কৌশল, বুয়েট